প্রাচীন ভারতে গুপ্ত রাজাদের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য গুলির পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিকবিদগণ গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ (Gupta Period Called the Golden Age of India) বলে থাকেন।
গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয় কেন | Gupta Period Called the Golden Age of India
খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে কুষাণ ও সাতবাহন সাম্রাজ্যের ধ্বংস স্তুপের ওপর গুপ্ত রাজাদের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানের সাথে সাথে প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
গুপ্ত বংশের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন মতবাদ পোষণ করেন। অনেকের মতে, গুপ্ত সম্রাটদের কোন সম্রাটদের অধীনে কর্মচারী ছিলেন। তাছাড়া সমসাময়িক লিপি থেকে জানা যায় নালন্দার পূর্বদিকে শ্রী গুপ্ত নামে এক রাজা গুপ্ত বংশের প্রথম দিকে রাজত্ব করতেন।
গুপ্ত বংশের প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা ছিলেন ঘটোৎকচের পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্ত। তার সময়কাল থেকে গুপ্ত বংশের সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু হয়।
গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রাচীন ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের এক গৌরবময় যুগ। এই যুগে রাজনৈতিক ঐক্যের পাশাপাশি সাহিত্য, শিল্পকলা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়। এই সমস্ত বিভিন্ন দিকের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণ গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয় কেন (Gupta Period Called the Golden Age of India) তার পশ্চাতে যে সমস্ত বিষয়গুলি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয় সেগুলি এখানে আলোকপাত করা হলো।
1. সাহিত্য ও দর্শন চর্চা
গুপ্ত যুগে বিভিন্ন শাসকের দ্বারা সাহিত্যচর্চা ও দর্শনচর্চার অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্থপতি বলা হলেও চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন এই সাম্রাজ্যের সার্থক সংগঠন। অর্থাৎ গুপ্ত সাম্রাজ্যকে রাজা চন্দ্রগুপ্ত পরিপূর্ণতা দান করেন। কেবলমাত্র শাসক হিসেবে নয় বরং সাহিত্য, সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসাবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত খ্যাতি ও অমরত্ব লাভ করেছিলেন। তাই চিনা পর্যটক ফা-হিয়েন চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের বিশেষ প্রশংসা করেছেন।
তাই কাব্য, নাটক, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে গুপ্ত যুগের অবদান অনস্বীকার্য। ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম রূপকার কালিদাস গুপ্তযুগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। কালিদাস তাঁর কাব্য ও নাটক রচনার দ্বারা সংস্কৃত সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে বিশেষ স্থান অর্জন করেছিলেন। কালিদাসের লেখা কুমার সম্ভব, রঘুবংশম, অভিজ্ঞান শকুন্তলম প্রভৃতি সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।
তাছাড়া গুপ্ত যুগে ভারবি, শূদ্রক, বিশাখদত্ত প্রমূখ সাহিত্য অনুরাগী ব্যক্তিবর্গ তাঁদের রচনার দ্বারা গুপ্ত যুগের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন।
2. বিজ্ঞান চর্চা
কেবলমাত্র সাহিত্যচর্চা নয় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রেও গুপ্ত যুগের অবদান বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। গণিতশাস্ত্র, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগের সৃজনশীলতার অবদান পাওয়া যায়। যেমন – আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত প্রমূখ বৈজ্ঞানিকগণ গুপ্তযুগের অমূল্য সম্পদ ছিলেন।
আর্যভট্টের রচিত সূর্যসিদ্ধান্ত থেকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির তত্ত্ব তথা সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের বিবরণ পাওয়া যায়। আবার বরাহমিহিরের লেখা গ্রন্থ থেকে জ্যোতিষ শাস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাছাড়া বর্তমানে গণিতশাস্ত্রে অধিক ব্যবহৃত দশমিক পদ্ধতি গুপ্ত যুগে আবিষ্কৃত হয়। তাই বিজ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
3. চিকিৎসা বিজ্ঞান
সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান এর পাশাপাশি গুপ্ত যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি সাধন হয়েছিল। অর্থাৎ ভারতবর্ষে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগের বিশিষ্ট চিকিৎসকগণের অবদান অনস্বীকার্য।
গুপ্তযুগের দুজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ছিলেন চরক ও সুশ্রুত। চরকের লেখা ‘চরক সংহিতা’ এবং সুশ্রুতের লেখা ‘সুশ্রুত সংহিতা’ থেকে সেযুগের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিবরণী পাওয়া যায়।
তাছাড়া পশুদের চিকিৎসার জন্য গুপ্ত যুগে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘হস্তায়য়ুবেদ’। এই গ্রন্থ থেকে হাতির নানা প্রকার রোগের বিবরণ পাওয়া যায়। আবার ঘোড়া বা অশ্বের চিকিৎসার জন্য ‘অশ্বশাস্ত্র’ রচিত হয়েছিল।
4. স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও শিল্পকলা
গুপ্তযুগে স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও শিল্পকলার প্রভূত উন্নতি হয়েছিল। অর্থাৎ এই তিনটি ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগ ছিল অসাধারণ সৃজনশীল। গুপ্ত যুগে সর্বপ্রথম ব্রাহ্মণ্য দেব দেবী সমন্বিত মন্দির স্থাপত্যের বিকাশ হয়। যেমন – অজয়গরের পার্বতী মন্দির, সাতনার একলিঙ্গ মন্দির প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
আবার গুপ্ত যুগে ভাস্কর্য শিল্প বিস্তার লাভ করে। গুপ্ত যুগে ভাস্কর্য শিল্পের মধ্যে গান্ধার শিল্পের বিকাশ লাভ ঘটেছিল। তাছাড়া সারনাথ ও মথুরার বৌদ্ধ মূর্তি গুলি গুপ্তযুগের ভাস্কর্য শিল্পীদের অসামান্য অবদান।
চিত্রকলা শিল্পে গুপ্ত যুগের বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া যায়। যেমন – অজান্তা ইলোরার গুহাচিত্র পৃথিবীর চিত্রকলার ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। বিশেষ করে অজান্তার দেওয়ালে অঙ্কিত মা ও ছেলে, বোধিসত্ত্ব প্রভৃতি চিত্র আজও দর্শকদের মন ভরিয়ে দেয়। তাই স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও শিল্পকলার অসামান্য অবদানের জন্য গুপ্ত যুগকে ভারতের সুবর্ণ যুগ (Gupta Period Called the Golden Age of India)হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
5. গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা
গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রাগুলি ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক উন্নতির পরিচয় বহন করেছিল। শাসক শ্রেণী, সামন্ত ও অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা হয়তো স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহার করত সেরকম আভাস পাওয়া যায়। তাই গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রা তৎকালীন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন – এই স্বর্ণমুদ্রার ফলে সাধারণ বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লোকে ইচ্ছামতো জিনিসপত্র কিনতে পারত না। মনে করা হয়, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার অভাবের কারণে সরকারি কর্মচারীদের বেতন হিসেবে ভূমি দান করা হতো।
উপসংহার
সর্বোপরি বলা যায়, গুপ্ত যুগে বিভিন্ন শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও চিত্রকলাসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন হয়েছিল। তাছাড়া প্রাচীন ভারতের গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিভাবান রাজা হিসেবে সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার প্রবর্তক। তাই বিশিষ্ট ঐতিহাসিকবিদগণ বলেছেন – সমুদ্রগুপ্তের জনকল্যাণমুখী উন্নত শাসন ব্যবস্থায় ভারতের সুবর্ণ যুগের (Gupta Period Called the Golden Age of India) ভিত্তি স্থাপন করে। এই জন্য গোখেল সমুদ্রগুপ্তকে প্রাচীন ‘ভারতের সুবর্ণ যুগের অগ্রদূত’ বলে অভিহিত করেছেন।
তথ্যসূত্র (Sources)
- Allaby, R. G. (2016) “Evolution .“Encyclopedia of Evolutionary Biology”. Ed. Kliman, Richard M. Oxford: Academic Press,19–24.
- Boyd, Brian. (2017) “Archaeology and Human-Animal Relations: Thinking through Anthropocentrism.” Annual Review of Anthropology 46.1, 299–316. Print.
- Gupta Period Called the Golden Age of India
- Online Sources
প্রশ্ন – কোন যুগকে বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয়? কেন?
উত্তর – গুপ্ত যুগকে বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বা সুবর্ণ যুগ বলা হয়ে থাকে।
প্রশ্ন – কোন যুগকে ভারতের স্বর্ণযুগ বলা হয়
উত্তর – গুপ্ত যুগকে ভারতের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কারণ গুপ্ত যুগে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, শিল্পকলা, ভাস্কর্য প্রভৃতির উন্নতি সাধন হয়েছিল।
প্রশ্ন – প্রাচীন ভারতের সুবর্ণ যুগের অগ্রদূত কাকে বলে
উত্তর – গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের জনকল্যাণমুখী কাজের জন্য গোখলে সমুদ্রগুপ্তকে ‘প্রাচীন ভারতের সুবর্ণ যুগের অগ্রদূত’ বলে অভিহিত করেছেন
আরোও পোস্ট পড়ুন
- কারক কাকে বলে? কত প্রকার ও উদাহরণ | Karok Kake Bole? Types of Karok with Examples
- অব্যয় পদ কাকে বলে? উদাহরণ ও প্রকারভেদ | Avyay Pad – Definition, Examples, Types and Uses
- CU BA বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা-১ সাজেশন | CU BA Bengali Suggestion | CCF Sem 2 and 4
- CU BA AEC ছোটগল্প ও কবিতা সাজেশন | AEC Short Stories and Poems Suggestion | Sem 4
- CU BA ইতিহাস সাজেশন | CU BA History Suggestion | CCF Sem 2 and 4 | Major, Minor and MDC
- CU BA AEC Compulsory English Suggestion Semester 2 | CCF
গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয় কেন | Gupta Period Called the Golden Age of India সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।





