দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে সঙ্গম যুগ বা সঙ্গম সাহিত্য (Sangam Literature) যুগ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সাহিত্যের মাধ্যমে তামিল ভাষার ব্যাপক উন্নতি সাধন ঘটেছিল। ফলে সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা মধ্যে এর বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
সঙ্গম যুগ ইতিহাস এর একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ বা অধ্যায়। কারণ এই যুগের সমাজে তামিল ও আর্য সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটেছিল। ফলে এই সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার গড়ে ওঠে এবং বহু তামিল ভাষ্যকার কাব্য রচনা করেছিলেন ও অন্যদিকে বহু সংস্কৃত শব্দকে তামিল ভাষার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
সঙ্গম সাহিত্য কথার অর্থ | Meanung of Sangam Literature UPSC
সঙ্গম শব্দটি কোনো খারাপ শব্দ নয়। সঙ্গম একটি দাবির শব্দ যার অর্থ হল – গোষ্ঠী, সমাজ বা পরিষদ। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু অঞ্চলে তামিল সাহিত্যের বিকাশকে কেন্দ্র করে সঙ্গম যুগের সূচনা ঘটে। ধারণা করা হয় যে, তামিল কবি ও পণ্ডিতরা একত্রিত হয়ে সাহিত্য রচনা ও আলোচনা করতেন। সেই সাহিত্য সভাকেই সঙ্গম বলা হতো।
সাধারণভাবে ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের এই ২০০বছরের সময় কালকে সঙ্গম যুগ বলা হয় । তামিল সাহিত্যের আদি যুগের কবি গোষ্ঠীর রচিত সাহিত্যকে সঙ্গম সাহিত্য বলা হয়।
এখানে সঙ্গম সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা বিস্তারিত ভাবে করা হল –
সঙ্গম সাহিত্য গোষ্ঠী | Sangam Literature Group
এই সাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সঙ্গম সাহিত্য গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর কয়টি শ্রেণীবিভাগ দেখা যায়। সেগুলি হল –
প্রথম সঙ্গম সাহিত্য স্থাপিত হয় প্রাচীন মাদুরাই শহরে। তামিল সাহিত্যে তিনটি সঙ্গম বা কবিদের পরিষদের কথা জানা যায় । মহামুনি অগস্ত এই কবি পরিষদের সভাপতি ছিলেন। এই পরিষদে কবি সদস্য ছিল ৫৪৯ জন । ৪৪৯৯ জন কবির কবিতা পরিষদ অনুমোদন করেছিল।
দ্বিতীয় কবি পরিষদ স্থাপিত হয় কপাতপুরম শহরে । এই পরিষদের সদস্য ছিল ৪৯ জন।
তৃতীয় কবি পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় মাদুরাই শহরে। এই তিনটি কবি পরিষদের মাধ্যমে রচিত হয় বহু কবিতা ও গ্রন্থ।
সঙ্গম সাহিত্য | Sangam Literature
সঙ্গম যুগের রচিত সাহিত্য গুলিকে বলা হয় সঙ্গম সাহিত্য। ঐতিহাসিক শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার বলেছেন – এই সাহিত্যের তিনটি ভাগ ছিল,যথা – কবিতা বা কবিতা দশক ,অষ্টসংকলন এবং অষ্টাদশ নীতিমূলক কবিতাগ্রন্থ।
সঙ্গম সাহিত্যে (Sangam Literature)-র বিষয়বস্তু প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—
- আকাম (Akam)
এখানে ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, দাম্পত্য সম্পর্ক, আবেগ ও অনুভূতির কথা বলা হয়েছে। - পুরাম (Puram)
এখানে যুদ্ধ, বীরত্ব, রাজনীতি, রাজাদের কীর্তি ও সামাজিক জীবনের বিবরণ পাওয়া যায়।
বর্ণনামূলক দশটি কবিতা
বর্ণনামূলক কবিতাদশক ছিল এই সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক । এখানে যেমন দেবতা মরুগানের পূজা ও মন্দিরের বিবরণ আছে, তেমনভাবে রাজা ও রানীদের জীবনের বর্ণনা এবং প্রাচীন তামিল সমাজ জীবনের বর্ণনা এই কবিতাগুলির মধ্যে পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে মরুথার, লক্কীরর প্রমুখ বিখ্যাত কবির কবিতা উল্লেখযোগ্য।
অষ্টসংকলন
এই সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অষ্টসংকলন বা আটটি গ্রন্থের সংকলন। বিভিন্ন ধরনের গীতিকবিতাকে নিয়ে সংকলনগুলি গঠিত হয় । কয়েকশত কবির লেখা বিভিন্ন ধরনের কবিতা ও গ্রন্থ অষ্টসংকলনে সংকলিত হয়েছিল।
এই অষ্টসংকলন গুলিতে বিভিন্ন রাজাদের জীবনচর্চা, প্রেম, বিরহ, মিলন, সমজজীবন প্রভৃতি বিষয়কে নিয়ে কাব্যগুলি রচিত হয়েছিল। কপিলর, অবৈব, পেরুম প্রমুখ এই সমস্ত কাব্যগুলির অন্যতম কবি ছিলেন।
অষ্টাদশ নীতিমূলক কবিতা
সঙ্গম যুগের নীতিমূলক কবিতা গ্রন্থের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য । এই যুগে ১৮ টি নীতিমূলক কবিতার গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। যেমন – জৈন কবিদের লেখা নালদিয়ার, তিরুবল্লুবর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ কুরল প্রভৃতি।
সঙ্গম সাহিত্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব | Historical Importance of Sangam Literature
এই সাহিত্য দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন ইতিহাস জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কারণ –
- তামিল রাজ্যগুলির রাজনৈতিক অবস্থা
- অর্থনীতি ও বাণিজ্য
- সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
উপসংহার | Conclusion
সর্বোপরি বলা যায় সঙ্গম যুগের বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় মানুষের বসবাস ছিল। এই সঙ্গম সাহিত্য (Sangam Literature) প্রধানত এই সমস্ত মানুষদের জীবন চরিত এবং চোল ও কেরল রাজাদের অনুকূল্যে রচিত হয়েছিল। ফলে তৎকালীন তামিল সাহিত্যের উন্নতি ঘটেছিল। তাছাড়া সঙ্গম সাহিত্যের মধ্যে বিভিন্ন পেশা ও বিভিন্ন ধরনের মানুষদের জীবনযাত্রা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তথ্যসূত্র (Sources)
- Allaby, R. G. (2016) “Evolution .“Encyclopedia of Evolutionary Biology”. Ed. Kliman, Richard M. Oxford: Academic Press,19–24.
- Boyd, Brian. (2017) “Archaeology and Human-Animal Relations: Thinking through Anthropocentrism.” Annual Review of Anthropology 46.1, 299–316. Print.
- Online Sources
প্রশ্ন – সঙ্গম সাহিত্য কি
উত্তর – ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের এই ২০০বছরের সময় কালকে সঙ্গম যুগ বলা হয় । তামিল সাহিত্যের আদি যুগের কবি গোষ্ঠীর রচিত সাহিত্যকে সঙ্গম সাহিত্য বলা হয়।
প্রশ্ন – সঙ্গম যুগের তিনটি সাহিত্য সম্মেলন কোথায় অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর – সঙ্গম যুগের তিনটি সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় –
i) প্রথম সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় – মাদুরাই শহরে
ii) দ্বিতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় – কপাতপুরম শহরে এবং
iii) তৃতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় – উত্তর মাদুরাই শহরে।
প্রশ্ন – সঙ্গম যুগে কোন ভাষা ব্যবহৃত হতো এর গুরুত্ব কী?
উত্তর – সঙ্গম যুগে তামিল ভাষা ব্যবহার হতো। এর গুরুত্ব হল – এর ফলে তৎকালীন তামিল সাহিত্যের উন্নতি ঘটেছিল।
প্রশ্ন – সঙ্গম সাহিত্য (Sangam Literature) কোন ভাষায় রচিত হয়
উত্তর – সঙ্গম সাহিত্য তামিল ভাষায় রচিত হয়।
প্রশ্ন – অষ্টসংকলন কি
উত্তর – সঙ্গম সাহিত্যের অষ্ট সংকলন হল ৮ টি গীতি কবিতার সংকলন গ্রন্থ। এই অষ্ট সংকলনে অসংখ্য তামিল কোবির প্রেম, মিলন, বিচ্ছেদ, বিনোদন ও নারীদের জীবন চর্চা প্রভৃতি বিষয় সংক্রান্ত কবিতার বাস্তবসম্মত দিকগুলি ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন – সঙ্গম যুগে নারীদের অবস্থা কেমন ছিল
উত্তর – সঙ্গম যুগে নারীদের অবস্থান ছিল বা মর্যাদা ছিল উন্নত। এই যুগে নারীরা গৃহের অন্তরালে থাকত না। তারা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পারত। ফলে তারা নিত্য, সঙ্গীত শিল্পকলা প্রভৃতিতে দক্ষ ছিল। এবং এই যুগে নারীরা শিক্ষিত প্রকৃতির ছিলেন।
আরোও পোস্ট পড়ুন
- CU BA Semester 1 ভারতের ইতিহাস সাজেশন | History of india upto 300 BCE Important Questions
- ভক্তি আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা | Bhakti Movement of India
- হিস্ট্রি ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য | Difference Between History and Itihasa
- মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস | History of the Mughal Empire
- প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান প্রশ্ন উত্তর | Sources of Ancient Indian History
- জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা | Difference between Jainism and Buddhism
সঙ্গম সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা | Sangam Literature in History সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।






1 thought on “সঙ্গম সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা | Sangam Literature in History”