বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের মধ্যে অন্যতম হল চন্ডীমঙ্গল। এই চন্ডীমঙ্গল কাব্যটি (Chandimangal Kavya) প্রধানত শিবজায়া দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য নিয়ে চৈতন্য যুগেই রচিত হয়েছে।
চন্ডীমঙ্গল কাব্যের বিষয়বস্তু ও কাহিনী | Theme of Chandimangal Kavya
বাংলা মঙ্গলকাব্যের মনসামঙ্গল কাব্যের মতো অন্যতম প্রধান শাখা হলো চণ্ডীমঙ্গল কাব্য (Chandimangal Kavya)। চৈতন্য যুগেই শিবজায়া দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য নিয়ে মঙ্গলচন্ডী কাব্য রচিত হয়েছে। বাংলাদেশে চন্ডী পূজার জনপ্রিয়তা যথেষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত হয়। চন্ডীমঙ্গল কাব্যগ্রন্থটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন – অভয়ামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, অন্নপূর্ণামঙ্গল প্রভৃতি নামে পরিচিত।
চন্ডীমঙ্গল কাব্যগ্রন্থে দেবী চণ্ডীর পুজো পদ্ধতি, ব্রতনিয়ম, কাহিনী প্রভৃতি আলোচিত হয়েছে। বাংলা চন্ডীমঙ্গলের দেবীকে অনেকে পুরোপুরি পৌরাণিক ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত বলে মনে করেন।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধান বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য হলো দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করা। দুটি কাহিনির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, কীভাবে তিনি মানুষের মধ্যে পূজিতা দেবী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। যারা তাঁকে অস্বীকার করে, তারা নানা বিপদের সম্মুখীন হয়। শেষে দেবীর শক্তি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
চন্ডীমঙ্গল কাব্যে দেবী চণ্ডী ও মানুষের মধ্যে সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের অহংকার ও দেবীর শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব কাহিনিকে গতিশীল করে। দেবী চণ্ডী বিভিন্নভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেন। এই সংঘাতের মাধ্যমে দেবীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে গ্রামীণ সমাজ, পেশা, বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। এতে মধ্যযুগীয় বাংলার সামাজিক কাঠামো স্পষ্ট হয়। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আচরণ ও সংস্কৃতি এতে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই এটি সমাজজীবনের এক মূল্যবান দলিল।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কাহিনী সংক্ষেপ | Story Summary of Chandimangal Kavya
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের (Chandimangal Kavya) কাহিনী মূলত দুটি প্রধান খন্ড ও দুটি উপাখ্যানে বিভক্ত, যথা –
১. আখেটিক খণ্ড – এখানে কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
২. বণিক খন্ড – এখানে ধনপতি ও খুল্লনার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
১. আখেটিক খণ্ড – কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান
দেবী চণ্ডী মর্ত্যলোকে পুজো পাওয়ার জন্য নিরপরাধ শিব পূজার পুষ্প চয়নকারী নীলাম্বরকে শাপের ফলে ধর্মকেতুর পুত্র কালকেতু রূপে জন্মগ্রহণ করেন। আর অপরদিকে তাঁর পত্নী ছায়া ব্যাধের কন্যা ফুল্লরা রূপে জন্মগ্রহণ করেন। চন্ডীমঙ্গলের এই উপাখ্যানটি আখেটিক খণ্ড নামে পরিচিত।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের (Chandimangal Kavya) অন্যতম প্রধান অংশ হলো কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যান। এখানে কালকেতু একজন দরিদ্র শিকারি, যিনি জঙ্গলে পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর স্ত্রী ফুল্লরা অত্যন্ত সহনশীলা, গৃহস্থবুদ্ধিসম্পন্ন ও স্নেহময়ী নারী। তারা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করলেও একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সহমর্মিতা বজায় রাখতেন।
এদিকে কালকেতুর বিক্রমে ও অত্যাচারে বনের বিপন্ন পশুরা দেবী চণ্ডীর কাছে জীবন প্রার্থনা করল।
‘কান্দে পশ আদি স্মরিয়া অভয়া।’
পশুগণকে অভয় দিয়ে দেবী- ‘সেইখানে সবর্ণ গোধিকা রূপ হৈলা। কালকেতু সেদিন শিকার পেল না। পথে দেখল স্বর্ণগোধিকা-অশুভ লক্ষণ। বিরক্ত হয়ে কালকেতু – ‘নকল বদলে তোমা খাইব’ – বলে সাপটিকে ধনুকের ছিলায় বেঁধে নিয়ে বাড়ীতে এল। সাপটিকে খুঁটিতে বেঁধে কালকেতু বাসি মাংস নিয়ে গেল বাজারে; আর ফুল্লরা প্রতিবেশীর নিকট খুদ ধার করতে গেল।
এদিকে নির্জনে অবসরে দেবী চণ্ডী গোধিকারূপ ত্যাগ করে অপরূপ রূপ ঘরের দাওয়ায় বসে রইল। ফুল্লরা ফিরে এলে দেবী বললেন –
‘এনেছে তোমার স্বামী বাঁধি নিজ গুণে’।
ফুল্লরা অনেক কাকুতি মিনতি করে’ তাদের বারমাসের দারিদ্র্যের বর্ণনা দিয়ে দেবীকে বিদায় করতে ব্যর্থ হয়ে স্বামীকে খবর দিতে গেল। বিস্মিত কালকেতু ঘরে এসে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে দেবীকে বিদায় করতে পারল না। অবশেষে ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে হত্যা করার জন্য ধনুকে শর যোজনা করতেই দেবী স্বমূর্তি ধারণ করে বললেন –
‘আমি চণ্ডী আইলাম তোরে দিতে বর।’
আর নির্দেশ দিলেন-
পূজিবে মঙ্গলবারে পাতাইবে জাত,
গুজরাট নগরের তুমি হবে নাথ।
দেবীর কৃপায় কালকেতু ধনী হয়ে ওঠে এবং একটি নতুন গুজরাট নগর প্রতিষ্ঠা করে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে নানা জাতির বসতি গড়ে উঠল। সে শিকারির জীবন ত্যাগ করে রাজাসুলভ জীবনযাপন শুরু করে। ফুল্লরাও তাঁর সঙ্গে থেকে গৃহস্থালির দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তবে এই উন্নতির পেছনে দেবী চণ্ডীর কৃপা ছিল মূল কারণ।
এই উপাখ্যানে কালকেতুর জীবনের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে দেবীর আশীর্বাদে নিম্নবিত্ত মানুষও উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। ফুল্লরার ধৈর্য, সহনশীলতা ও স্বামীর প্রতি অনুগততা কাহিনিকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কালকেতু দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য উপলব্ধি করে তাঁর পূজা প্রতিষ্ঠা করেন। পরম শান্তিতে দীর্ঘকাল রাজ্যশাসনের পর কালকেতু ও ফুল্লরা পুত্রকে রাজ্যভার দিয়ে শাপান্তে নীলাম্বর ও ছায়ারূপে ইন্দ্রের রথে চড়ে স্বর্গে ফিরে গেলেন। পৃথিবীতে দেবী চণ্ডীর পুজো প্রচারিত হল। এর মাধ্যমে দেবী চণ্ডীর শক্তি ও কৃপা সর্বত্র স্বীকৃতি লাভ করে। এই উপাখ্যানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, আশা এবং ঈশ্বরবিশ্বাসের এক সুন্দর চিত্র ফুটে ওঠে।
২. বণিক খন্ড – ধনপতি ও খুল্লনার উপাখ্যান
দেবী চণ্ডী মর্তলোকে পুজোর জন্য স্বর্গনর্তকী রত্নমালাকে অভিশাপগ্রস্থ করেন। এর ফলে লক্ষ-পতি বণিকের ঘরে রত্নমালা খুল্লনা রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি শ্রীমন্ত নামে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন এই শ্রীমন্তের সহায়তায় পরবর্তীকালে দেবী চণ্ডীর পূজা মর্তলোকে প্রচারিত হয়।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে (Chandimangal Kavya) ধনপতি সওদাগর একজন ধনী বণিক। যিনি দেবী চণ্ডীর পূজা করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি লহনাকে বিয়ে করেন কিন্তু তার কোন সন্তান হননি। পরবর্তীকালে খুল্লনার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেন। খুল্লনার পুত্র সন্তান ছিল যার নাম শ্রীমন্ত। ধনপতি তাঁর প্রথম স্ত্রী লহনা, পরে তিনি খুল্লনাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন ও সুখে শান্তিতে বসবাস করেন। কিন্তু এতে লহনার মনে ঈর্ষা জন্মায় এবং সে খুল্লনার উপর নানা অত্যাচার করতে থাকে।
খুল্লনা অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা ও সহনশীলা হওয়ায় দেবী চণ্ডীর প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করেন। লহনার ষড়যন্ত্রে খুল্লনাকে অপমানিত ও নির্যাতিত হতে হয়। এমনকি তাকে বনাঞ্চলে ছাগল চরানোর মতো কষ্টকর জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়।
এই সময় দেবী চণ্ডী খুল্লনার স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে তাকে আশীর্বাদ করেন এবং তার দুঃখ লাঘবের প্রতিশ্রুতি দেন। পরে ধনপতি বাণিজ্যের জন্য বিদেশে (সিংহল) যাত্রা করেন। সেখানে তিনি নানা বিপদের সম্মুখীন হন এবং সিংহল রাজের কাছে বন্দীও হন—যা দেবীর রোষের ফল।
এদিকে খুল্লনার পুত্র শ্রীমন্ত বড় হয়ে পিতার সন্ধানে বের হয়। সিংহলে গিয়ে শ্রীমন্ত সিংহল রাজার কাছে বন্দী হন। ও রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। শ্রীমন্ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চন্ডীর স্তব করতে থাকেন। দেবী চণ্ডী বৃদ্ধ ব্রাহ্মণির বেশে শ্রীমন্তকে উদ্ধার করেন। চন্ডির ভূতপ্রেত সিংহল রাজার সব সৈন্য ধ্বংস করে। সিংহলের রাজা শেষ পর্যন্ত ধনপতি ও সীমন্তকে মুক্তি দেন। ধনপতির একমাত্র পুত্র শ্রীমন্তর সঙ্গে সিংহল রাজা একমাত্র কন্যা সুশিলার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর চন্ডির প্রসাদে সিংহলরাজকে কমলে কামিনী দর্শন করালেন। রাজা শালীবাহন দেবী চণ্ডীর পুজো করতে মনস্ত করেন।
কিছুদিন সিংহলে বসবাসের পর পুত্র ও পুত্রবধূকে সঙ্গে নিয়ে ধনপতি স্বদেশে ফিরে যান। স্বদেশে ফিরে গিয়ে ধনপতি মহাধুমধামে দেবী চণ্ডীর পূজা করেন। এর ফলে মর্ত্যলোকে ধনপতির মাধ্যমে চন্ডীর পূজা প্রচার পায়। বাকি জীবন স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে সুখে কাটিয়ে ধনপতি স্বর্গে ফিরে যান।
চন্ডীমঙ্গল কাব্যের খন্ড | Sections of the Chandimangal Kavya
চন্ডীমঙ্গল কাব্যের (Chandimangal Kavya) কাহিনী দুটি খন্ডের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ চন্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধান দুটি খন্ড। সে দুটি হল –
- ১. আখেটিক খণ্ড – এখানে কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
- ২. বণিক খন্ড – এখানে ধনপতি ও খুল্লনার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
উপসংহার
তাই বলা যায়, মঙ্গলকাব্য হিসেবে চণ্ডীমঙ্গল কাব্য (Chandimangal Kavya) একটি বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম। এতে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সমাজের বাস্তব চিত্র একত্রে প্রকাশিত হয়েছে। দুটি খন্ডে কালকেতু ও ধনপতির কাহিনির মাধ্যমে দেবীর শক্তি ও মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাংলা মঙ্গলকাব্যের ধারায় চন্ডীমঙ্গল কাব্যের গুরুত্ব অপরিসীম।
তথ্যসূত্র | Sources
- বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৩-৫ খন্ড)- সুকুমার সেন
- বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস- সজনীকান্ত দাস
- বাংলা সাহিত্যে গদ্য- সুকুমার সেন
- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (৬-৯)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
- বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা (৩-৪)- ভূদেব চৌধুরী
- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – প্রাচীন ও মধ্যযুগ – ডক্টর শ্রীমন্তকুমার জানা – ওরিয়েন্টাল বুক কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড।
- Einsohn, A., & Schwartz, M. (2019). The copyeditor’s handbook: A guide for book publishing and corporate communications (4th ed.). University of California Press.
- Butcher, J., Drake, C., & Leach, M. (2016). Butcher’s copy-editing: The Cambridge handbook for editors, copy-editors and proofreaders (4th ed.). Cambridge University Press.
- Chicago Manual of Style. (2017). The Chicago manual of style (17th ed.). University of Chicago Press.
- Ritter, R. M. (2015). The Oxford guide to style (New Hart’s rules) (2nd ed.). Oxford University Press.
- Luey, B. (2010). Handbook for academic authors (5th ed.). Cambridge University Press.
- Theme & Story of Chandimangal Kavya
- Internet sources
প্রশ্ন – চন্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর – চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী-কে গণ্য করা হয়।
প্রশ্ন – চন্ডীমঙ্গল কাব্যের কয়টি খন্ড ও কি কি
উত্তর – চন্ডীমঙ্গল কাব্যের দুটি খন্ড, সেই দুটি হল – আখেটিক খন্ডও বণিক খণ্ড।
Latest Articles
- ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রশ্ন উত্তর | Fort William College Quiz Question and Answers for Competitive Exams
- বাংলা গদ্য সাহিত্যে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান | Contribution of Serampore Mission to Bengali Prose
- বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান | Contribution of Fort William College Bengali Prose
- বাংলা গদ্য সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা | Vidyasagar Contribution to Bengali Literature
- বাংলা গদ্যের বিকাশে রামমোহন রায়ের অবদান | Raja Ram Mohan Roy in Prose Literature





2 thoughts on “চন্ডীমঙ্গল কাব্যের বিষয়বস্তু ও কাহিনী | Chandimangal Kavya”