Share on WhatsApp Share on Telegram

চর্যাপদ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব | Historical Importance of Charyapada

বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের অন্যতম সাহিত্যিক নিদর্শন হল চর্যাপদ। তাই চর্যাপদ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Historical Importance of Charyapada) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম দিক।

চর্যাপদ কি?

চর্যাপদ হল বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ধর্ম সাধনার প্রণালীর একটি অন্যতম গ্রন্থ। চর্যাপদ গ্রন্থে চর্যাগীতিগুলি গভীরভাবে অনুধাবন করলে দেখা যায় যে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্ম সাধনায় দর্শন তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। তবে চর্যাপদের দার্শনিক পটভূমি মহাজন বৌদ্ধ ধর্মের দার্শনিক মতবাদের সমন্বয়ে গঠিত।

চর্যাপদ পুঁথির আবিষ্কার

মনে করা হয় বাংলায় পাল রাজত্বের সময়ে চর্যাপদ রচিত হয়। কিন্তু মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপাল রাজ দরবার থেকে ১৯০৭ সালে অনেকগুলি পুঁথির সঙ্গে চর্যাচর্যবিনিশ্চয় নামক প্রতিটি আবিষ্কার করেন। তবে তাঁর এই আবিষ্কার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

চর্যাপদ পুঁথির আবিষ্কারের পর বিভিন্ন সাহিত্যিকের বিভিন্ন নামকরণ করেন। কিন্তু পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মহাশয়ের ব্যবহৃত চর্যাচর্যবিনিশ্চয় নামটি বহুল প্রচলিত হয়। পরবর্তীকালে পুঁথি টিকে সংক্ষেপে চর্যাগীতি পদাবলী বলা হয়ে থাকে।

চর্যাপদের রচনাকাল

চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্যিকদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদ বর্তমান। অনেকে বলেন চর্যাপদের পুঁথিটি চতুর্দশ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ের। এতে মোট ৫০ টি পদ চব্বিশ জন কবি রচনা করেন।। কিন্তু তিনটি পদ ও একটি পদের শেষ অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই পুঁথিটি থেকে মোট ৪৬ টি পদ পাওয়া গেছে।

আবার অনেকে মনে করেন বিশেষ করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় – চর্যাপদ অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখা হয়েছে। কারন চার্যকার সরহপাদ অষ্টম শতাব্দীতে ও কাহ্নপাদ দ্বাদশ শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন।

চর্যাপদের ভাষা বৈশিষ্ট্য

চর্যাপদের ভাষা বৈশিষ্ট্য নিয়ে বহু মতান্তর পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন সাহিত্যিক গবেষক চর্যাপদের ভাষা নিয়ে বহু গবেষণা করেছেন। বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর কালিপ্রসাদ জয়সওয়াল বলেছেন – চর্যাপদের ভাষা হল হিন্দির সমতুল্য। আবার ডক্টর জয়কান্ত মিশ্র বলেছেন – চর্যাপদের ভাষা হল প্রাচীন মৈথিলী ভাষার নিদর্শন।

উড়িষ্যা ও আসামের অনেক পন্ডিতগণ চর্যাপদের ভাষাকে তাদের ভাষার আদি রূপ বলে দাবি করেন।

চর্যার ভাষাকে সান্ধ্য ভাষা বা সন্ধ্যা ভাষা বলার কারণ

চর্যাপদের সমাজ জীবন, গার্হস্থ জীবন প্রভৃতির বর্ণনা থেকে অনেক সাহিত্যিক গবেষক বলেন চর্যাপদের মধ্যে সন্ধ্যা ভাষার আগমন ঘটেছে। সন্ধ্যা ভাষার মানে হলো আলো-আঁধারী ভাষা। কিছু কিছু শব্দ বোঝা যায়, আবার কিছু কিছু শব্দ খানিকটা বুঝা যায় ও বুঝা যায় না। অর্থাৎ চর্যাপদের ভাষার মধ্যে উচ্চ অঙ্গের ভাব প্রকাশিত হয়েছে।

চর্যাপদ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব | Historical Importance of Charyapada

চর্যাপদের কেবল সাহিত্য মূল্য বর্তমান নয় চর্যাপদ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Historical Importance of Charyapada) বা মূল্য বর্তমান। চর্যাপদের মূল বিষয়বস্তু ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। দেহসাধনার তত্ত্ব চর্যাপদের সমস্ত পদে প্রকাশ পেয়েছে। চর্যাপদ ধর্ম আশ্রিত বলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বা সাহিত্যিক উৎকর্ষের ব্যাঘাত ঘটেনি। গভীর চিন্তাভাবনা ও সামাজিক জীবন তুলে ধরায় চর্যাপদের অন্যতম দিক।

চর্যাপদের দর্শন ও কাব্যিক বিচার সম্পর্কে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ বলেছেন – “The philosophy says that the world is rational: But the poetry says that the world is beatiful.” অর্থাৎ এই উক্তিতে বলা হয়েছে যে দর্শন (Philosophy) ও কবিতা (Poetry) পৃথিবীকে ভিন্নভাবে দেখে।

দর্শনের দৃষ্টিতে, পৃথিবী যুক্তিনির্ভর। অর্থাৎ এখানে সব কিছুর কারণ, নিয়ম, সত্য, প্রমাণ এবং বিশ্লেষণ আছে। দর্শন জগতকে বোঝার চেষ্টা করে চিন্তা, যুক্তি ও তত্ত্বের মাধ্যমে।

কিন্তু কবিতার দৃষ্টিতে, পৃথিবী সুন্দর। কবিতা যুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় অনুভূতি, কল্পনা, সৌন্দর্য, আবেগ ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, চর্যাপদ বা চর্যাগীতি পদাবলীতে বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। তাই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশে চর্যাপদের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলা সাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদ ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্য হলেও মানুষকে অবিদ্যা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য এক মহৎ ঐতিহ্য স্থাপন করেছে। তাই অনেক সাহিত্যিক গবেষক চর্যাপদকে আধুনিককালের বাংলা সাহিত্য চর্চার সেই ঐতিহ্যকে উত্তর আধিকার হিসাবে গণ্য করেন।

তথ্যসূত্র | Sources

  • বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৩-৫ খন্ড)- সুকুমার সেন
  • বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস- সজনীকান্ত দাস
  • বাংলা সাহিত্যে গদ্য- সুকুমার সেন
  • বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (৬-৯)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
  • বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা (৩-৪)- ভূদেব চৌধুরী
  • বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – প্রাচীন ও মধ্যযুগ – ডক্টর শ্রীমন্তকুমার জানা – ওরিয়েন্টাল বুক কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড।
  • Einsohn, A., & Schwartz, M. (2019). The copyeditor’s handbook: A guide for book publishing and corporate communications (4th ed.). University of California Press.
  • Butcher, J., Drake, C., & Leach, M. (2016). Butcher’s copy-editing: The Cambridge handbook for editors, copy-editors and proofreaders (4th ed.). Cambridge University Press.
  • Chicago Manual of Style. (2017). The Chicago manual of style (17th ed.). University of Chicago Press.
  • Ritter, R. M. (2015). The Oxford guide to style (New Hart’s rules) (2nd ed.). Oxford University Press.
  • Luey, B. (2010). Handbook for academic authors (5th ed.). Cambridge University Press.
  • Internet sources

চর্যাপদ প্রশ্নোত্তর MCQ

প্রশ্ন – চর্যাপদ কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর – চর্যাপদ আবিষ্কার করেন মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়।

প্রশ্ন – চর্যাপদ কে কবে কোথা থেকে আবিষ্কার করেন?

উত্তর – মহামহোপাধ্যায় পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপাল রাজ দরবার থেকে ১৯০৭ সালে অনেকগুলি পুঁথির মধ্যে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন।

প্রশ্ন – চর্যাপদ কোন ভাষায় রচিত?

উত্তর – চর্যাপদের ভাষা বৈশিষ্ট্য নিয়ে বহু মতান্তর বর্তমান। কোন কোন সাহিত্য বিশারদ বলেন – চর্যাপদ হিন্দি ভাষার সমতুল্য। আবার কারো কারো মতে চর্যাপদের ভাষা মৈথিলী ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন।

Latest Articles

চর্যাপদ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব | Historical Importance of Charyapada সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

Mr. Debkumar – Author and Founder of Edubitan.in

Mr. Debkumar – Author and Founder of Edubitan.in

একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক, যিনি ডিগ্রি কলেজে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পাঠদান করছেন এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্য ও সার্বিক বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি শিক্ষামূলক ডিজিটাল রিসোর্স ও প্রকাশনা তৈরিতেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। Edubitan -এর অনলাইন স্টোর store.edubitan.com এর মাধ্যমে তিনি শিক্ষাবিষয়ক মানসম্পন্ন PDF বই (Educational eBooks) ও স্টাডি ম্যাটেরিয়াল প্রকাশ করেন, যা শিক্ষার্থী, গবেষক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীদের সহায়তা করে।

An experienced educator with more than ten years of teaching in a general degree college, dedicated to fostering academic excellence and holistic student growth. He is also the creator of structured digital learning resources and educational publications. Through Edubitan and its online store store.edubitan.com, he publishes and distributes curated PDF books (Educational eBooks) and study materials in education to support students, researchers, and competitive exam aspirants.

Leave a Comment

close
✅ Copied with source!