বাংলা ব্যাকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল কারক (Karok)। এটি বাংলা ব্যাকরণকে সমৃদ্ধশালী করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এখানে কারক কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি, উদাহরণসহ আলোচনা করা হল।
কারক কাকে বলে? Karok Kake Bole Bangla
বাংলা ভাষায় যেকোনো বাক্যের বিভিন্ন পদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাক্যে কে কাজ করছে, কাকে নিয়ে কাজটি হচ্ছে, কী দিয়ে কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে, কোথা থেকে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, কোথায় কাজটি সংঘটিত হচ্ছে—এই ধরনের সম্পর্ক বোঝার জন্য কারক (Karok) সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
- সাধারণভাবে বাক্যে অবস্থিত প্রধান ক্রিয়ার সঙ্গে বাক্যের অন্তর্গত অন্য পদের যে সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয় তাকে কারক বলে। অর্থাৎ ক্রিয়ার সঙ্গে বাক্যের অন্যান্য পদের অন্বয় বা সম্পর্ককে কারক হিসাবে গণ্য করা হয়। বিশিষ্ট ব্যাকরণবিদ পানিনি বলেছেন – ‘ক্রিয়ান্বরী কারকম্’।
তাই বাক্যে ব্যবহৃত বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সঙ্গে ক্রিয়াপদের যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাকে কারক বলে। সুতরাং বাক্যের ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সঙ্গে ক্রিয়ার যে ব্যাকরণগত সম্পর্ক প্রকাশ পায়, সেটিই কারক।
কারকের উদাহরণ | Example of Karok
কর্মের সঙ্গে অন্যান্য পদের সম্পর্কের মাধ্যমে কারকের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। । কারকের কয়েকটি উদাহরণ এখানে দেয়া হল –
১. রাজা প্রতাপাদিত্য নিজে হস্তে দরিদ্র মানুষকে রাজকোষ থেকে স্বর্ণ মুদ্রা দান করতেন।
- এখানে প্রধান ক্রিয়া হল – দান করা। এই প্রধান ক্রিয়ার সঙ্গে অন্যান্য পদের সম্পর্ক আছে। তাই অন্যান্য পদের সঙ্গে ক্রিয়ার এই সম্পর্কই হল কারক।
২. জয়িতা বই পড়ে। এখানে—
- জয়িতা — যে পড়ার কাজটি করছে।
- বই — যেটি পড়া হচ্ছে।
- পড়ে — ক্রিয়াপদ।
অর্থাৎ, ‘জয়িতা’ ও ‘বই’ পদের সঙ্গে ‘পড়ে’ ক্রিয়াপদের পৃথক সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কই কারক।
কারকের প্রকারভেদ | Types of Karok
কর্তার বা কর্মের উপর ভিত্তি করে কারককে প্রধানত ছটি ভাগে ভাগ করা হয়, সেগুলি হল –
- কর্তৃকারক (Nominative Case)
- কর্মকারক (Accusative Case)
- করণকারক (Instrumental Case)
- সম্প্রদান কারক (Dative Case)
- অপাদান কারক (Ablative Case) ও
- অধিকরণ কারক (Locative Case)
কর্তৃকারক (Nominative Case)
যে কারকে বাক্যের কর্তা বা কর্তা-স্থানীয় পদ বোঝায় বা যে ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তু ক্রিয়ার কাজটি সম্পন্ন করে, তাকে কর্তৃকারক বলে। অর্থাৎ ক্রিয়াপদকে ‘কে?’ বা ‘কারা?’ প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটি সাধারণত কর্তৃকারক। এই কারকে কর্তা থাকে।
- উদাহরণ – জয়িতা স্কুলে যায়।
এখানে কে স্কুলে যায়? উত্তর হল – জয়িতা। তাই রবি হল কর্তা। ‘জয়িতা’ যাওয়ার কাজটি করছে। তাই ‘রবি’ কর্তৃকারক।
আরও উদাহরণ:
- পাখিরা আকাশে উড়ছে।
- সিতা গান গাইছে।
- ছেলেরা মাঠে খেলছে।
- সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে।
উপরের বাক্যগুলিতে ‘পাখিরা’, ‘সিতা’, ‘ছেলেরা’ ও ‘সূর্য’ ক্রিয়ার কর্তা। তাই এগুলি কর্তৃকারক।
কর্মকারক (Accusative Case)
কর্তা যাকে আশ্রয় করে ক্রিয়াকে পরিচালনা করে, তাকে কর্মকারক বলে। তাই যে কারকে কর্তার কাজের ফল বা ক্রিয়ার লক্ষ্য যে ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর ওপর পড়ে, তাকে কর্মকারক বলে।
অর্থাৎ কর্তা যাকে বা যেটিকে নিয়ে কাজটি করে, সেটিই কর্ম। ক্রিয়াপদকে ‘কাকে?’ বা ‘কী?’ দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটি সাধারণত কর্মকারক।
- উদাহরণ – মিতা বই পড়ে।
এখানে মিতা কি পড়ে? এখানে ‘মিতা’ বই পড়ার কাজ করছে বা ‘বই’ পড়ার কাজের বিষয়। তাই ‘বই’ কর্মকারক।
আরও উদাহরণ:
- জয়িতা আম খায়।
- মা শিশুকে ডাকলেন।
- শিক্ষক ছাত্রদের পড়াচ্ছেন।
- আমি চিঠি লিখেছি।
এখানে ‘আম’, ‘শিশুকে’, ‘ছাত্রদের’ ও ‘চিঠি’ হল কর্মকারক।
করণকারক (Instrumental Case)
কর্তা যার সাহায্যে ক্রিয়া বা কাজ সম্পাদন করেন, তাকে করণ কারক বলে। তাই যে উপায় বা সহায়কের দ্বারা ক্রিয়া সম্পাদন করা হয়, তাই হল করণকারক।
অর্থাৎ যে কারকের মাধ্যমে কর্তা কোনো কাজ সম্পন্ন করে, বা যে উপায়, উপকরণ বা মাধ্যমের সাহায্যে কাজটি সম্পন্ন হয়, তাকে করণকারক বলে।
ক্রিয়াপদকে ‘কী দিয়ে?’ বা ‘কিসের সাহায্যে?’ প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটি সাধারণত করণকারক।
- উদাহরণ – জয়িতা কলম দিয়ে লেখে।
এখানে জয়িতা কি দিয়ে বা কিসের সাহায্যে লেখে? এখানে লেখার কাজটি ‘কলম’-এর সাহায্যে সম্পন্ন হচ্ছে। তাই ‘কলম দিয়ে’ হল করণকারক।
আরও উদাহরণ:
- কৃষক লাঙল দিয়ে জমি চাষ করেন।
- সে ছুরি দিয়ে ফল কাটল।
- শিল্পী তুলির সাহায্যে ছবি আঁকলেন।
- শ্রমিক হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকল।
সম্প্রদান কারক (Dative Case)
যাকে কোনো কিছু নিঃস্বার্থভাবে দান করা হয়, সেটিকে ব্যাকরণে সম্প্রদান কারক হিসেবে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ সম্প্রদান এর অর্থ হল কোনো কিছু দান করা বা অর্পণ করা বা প্রদান করা।
বাক্যের ক্রিয়াপদকে কেন্দ্র করে ‘কাকে দেওয়া হলো?’ বা ‘কার জন্য দেওয়া হলো?’ প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, তা সম্প্রদান কারক।
অর্থাৎ, কোনো বস্তু বা জিনিস যাকে দেওয়া হয়, সেই পদ সম্প্রদান কারক নির্দেশ করে।
- উদাহরণ – মা শিশুকে খাবার দিলেন।
এখানে ‘খাবার’ দেওয়া হয়েছে এবং ‘শিশু’ সেই খাবার গ্রহণ করছে। তাই ‘শিশুকে’ সম্প্রদান কারক।
আরও উদাহরণ:
- বাবা ছেলেকে একটি বই দিলেন।
- আমি ভিখারিকে টাকা দিলাম।
- শিক্ষক ছাত্রকে পুরস্কার দিলেন।
- সে বন্ধুকে একটি কলম উপহার দিল।
অপাদান কারক (Ablative Case)
যেখান থেকে কোন বস্তু ব্যক্তি পতিত হয় বা চুত হয়, সেটি অপাদান কারক। তাই যে কারকে কোনো স্থান, ব্যক্তি বা বস্তু থেকে বিচ্ছিন্নতা, উৎপত্তি, পতন, দূরত্ব বা উৎস বোঝায়, তাকে অপাদান কারক বলে।
সহজভাবে বলা যায়, যেখান থেকে কোনো কিছু পৃথক হয় বা যার কাছ থেকে কোনো কিছু আসে, তা বোঝাতে অপাদান কারক ব্যবহৃত হয়।
ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ‘কোথা থেকে?’, ‘কার কাছ থেকে?’ বা ‘কী থেকে?’ প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, তা সাধারণত অপাদান কারক।
- উদাহরণ – গাছ থেকে পাতা পড়ে।
এখানে পাতা গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। তাই ‘গাছ’ অপাদান কারক। কারণ পাতা গাছ থেকে পতিত হল বা পতন হলো এবং ‘গাছ’ হল বিশেষ্য পদ।
আরও উদাহরণ:
- গাছ থেকে ফল পড়ল।
- ঢাকা থেকে কলকাতায় এলাম।
- দুধ থেকে দই তৈরি হয়।
- পাহাড় থেকে নদী নেমে এসেছে।
অধিকরণ কারক (Locative Case)
যে স্থানে বা যে সময়ে কোন ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, বা স্থান ও সময় বোঝালে তখন সেই সময়কে অধিকরণ কারক হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ যে কারকে কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার স্থান, সময় বা আধার বোঝায়, তাকে অধিকরণ কারক বলে। যেমন – কোথায়, কখন বা কোন স্থানে/সময়ে কাজটি সংঘটিত হচ্ছে, তা বোঝাতে অধিকরণ কারক ব্যবহৃত হয়।
অধিকরণ কারক আবার চার প্রকারের হয়ে থাকে। যথা –
- স্থানাধিকরন – স্থান বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন – টাকাটা রাস্তায় পড়ে আছে। এখানে রাস্তা হলো স্থান।
- কালাধিকরন – সময় বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন – আম পাকে বৈশাখে। এখানে বৈশাখ মাস হলো সময়।
- বিষয়াধিকরন – বিষয় বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন – সে ইতিহাসে বি.এ পাস করেছে। এখানে ইতিহাস হল বিষয়।
- ভাবাধিকরণ – মনের ভাব ব্যক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন – দুঃখে সে খুব কাতর। এখানে দুঃখ হলো ভাব।
ক্রিয়াপদকে ধরে ‘কোথায়?’ বা ‘কখন?’ প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটি সাধারণত অধিকরণ কারক।
- উদাহরণ – ছাত্ররা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।
ছাত্ররা কোন স্থানে বা কোথায় পড়াশোনা করে? এখানে পড়াশোনার কাজটি ‘বিদ্যালয়ে’ সংঘটিত হচ্ছে। তাই ‘বিদ্যালয়ে’ অধিকরণ কারক।
আরও উদাহরণ:
- পাখি গাছে বসে আছে।
- শিশুরা মাঠে খেলছে।
- সে সকালে ঘুম থেকে ওঠে।
- শীতে ঠান্ডা বেশি পড়ে।
- মাছ জলে বাস করে।
এখানে ‘গাছে’, ‘মাঠে’, ‘সকালে’, ‘শীতে’ ও ‘জলে’ অধিকরণ কারক।
কারকের (Karok) প্রকারভেদের সংক্ষিপ্তসার
| কারক | ধারণা | চেনার প্রশ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| কর্তৃকারক | যে কাজ করে | কে? কারা? | জয়িতা বই পড়ে। |
| কর্মকারক | যার ওপর কাজের প্রভাব পড়ে | কাকে? কী? | জয়িতা বই পড়ে। |
| করণকারক | যার সাহায্যে কাজ হয় | কী দিয়ে? কিসের সাহায্যে? | সে কলম দিয়ে লেখে। |
| সম্প্রদান কারক | যাকে কিছু দেওয়া হয় | কাকে দেওয়া হলো? | মা শিশুকে খাবার দিলেন। |
| অপাদান কারক | যেখান থেকে বিচ্ছিন্নতা/উৎস বোঝায় | কোথা থেকে? কার কাছ থেকে? | গাছ থেকে পাতা পড়ে। |
| অধিকরণ কারক | কাজের স্থান/সময় | কোথায়? কখন? | সে বিদ্যালয়ে পড়ে। |
উপসংহার
বাংলা ব্যাকরণের একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো কারক (Karok)। একটি বাক্যে বিভিন্ন বিশেষ্য ও সর্বনাম পদের সঙ্গে ক্রিয়াপদের কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা বুঝতে কারকের ধারণা অপরিহার্য। সুতরাং, বাংলা বাক্যের গঠন ও অর্থ সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে কারক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণগত ধারণা।
📚 আরও সাজেশন, নোটস ও PDF স্টাডি ম্যাটেরিয়াল
Calcutta University-এর সাজেশন, নোটস, প্রশ্নোত্তর, PDF Book এবং অন্যান্য
স্টাডি ম্যাটেরিয়াল পেতে আমাদের Edutiips ও Edubitan
ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করুন।
তথ্যসূত্র | Sources
- অভিনব বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা – ড. গোবিন্দ সরকার – অভিনব প্রকাশন
- আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ ও ভাষা বিচিত্রা – ড. বিশ্বজনীন মজুমদার – দে বুক
- বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা – ড. স্বরাজকুমার দাস – দেশ পাবলিকেশন
- University of Calcutta. Curriculum and Syllabus for B.A. Bengali (CCF). Kolkata: University of Calcutta.
- University of Calcutta. Previous Years’ B.A. Bengali Examination Question Papers.
- Karok Kake Bole? Types of Karok with Examples
- PDF Book or Study Materials
প্রশ্ন – কোন সমাসে কারক সম্পর্ক বিদ্যমান
উত্তর ⟶ অব্যয়ীভাব সমাসে কারক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। যেমন – আমরণ = মরণ পর্যন্ত — এখানে ‘আম’ অব্যয়ের সঙ্গে ‘মরণ’-এর কারক সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশ্ন – কারক কয় প্রকার ও কি কি
উত্তর – কারক প্রধানত ৬ প্রকার। এগুলি হল – কর্তৃকারক (Nominative Case), কর্মকারক (Accusative Case), করণকারক (Instrumental Case), সম্প্রদান কারক (Dative Case), অপাদান কারক (Ablative Case) ও অধিকরণ কারক (Locative Case)।
প্রশ্ন – Karok kake bole bangla
উত্তর – সাধারণভাবে বাক্যে ব্যবহৃত ক্রিয়া পদের সঙ্গে অন্যান্য বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের একটা সমন্বয় বা সম্পর্ক আছে, এই সম্বন্ধ হল কারক। যেমন – তিনি চোখের জল মোছেন। এখানে কে চোখের জল মোছেন। উত্তর হল তিনি। এটি কর্তৃকারকের উদাহরণ।
Latest Articles
কারক কাকে বলে? কত প্রকার ও উদাহরণ | Karok Kake Bole? Types of Karok with Examples সম্পূর্ণ পোস্ট পড়ার জন্য ধন্যবাদ।


