বাংলা সাহিত্যে বিশেষত শাক্ত পদাবলীতে বিভিন্ন কবিদের মধ্যে রামপ্রসাদ সেনের কবি কৃতিত্ব (Ramprasad Sen Achievements) ছিল অনন্য এবং অন্যতম।
রামপ্রসাদ সেনের জীবনী | Ramprasad Sen Biography
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আনুমানিক 1720 থেকে 1721 খ্রিস্টাব্দে রামপ্রসাদ সেন ২৪ পরগনার হালিশহরের কুমারহট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রামপ্রসাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন খুব ধনী ব্যক্তি। কিন্তু পরবর্তীকালে নানা কারণে তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। রামপ্রসাদ ছিলেন দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। রামপ্রসাদের নিজের দুটি গুরুত্ব ও দুটি কন্যা ছিলেন।
শাক্ত পদাবলী রামপ্রসাদ সেনের কবি কৃতিত্ব আলোচনা | Ramprasad Sen Achievements
অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে শাক্ত পদাবলীকে ঘিরে বিভিন্ন ছোট বড় কবিদের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন শাক্ত পদাবলীতে কবি কৃতিত্বের অধিকারী। আর এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রামপ্রসাদ সেন। তাই রামপ্রসাদ সেনের কবি কৃতিত্বের (Ramprasad Sen Achievements) জন্য তাঁকে আদি শাক্ত কবি বলা হয়ে থাকে।
রামপ্রসাদ সেনের কবি কৃতিত্ব বা শাক্ত পদাবলীতে রামপ্রসাদ সেনের কৃতিত্ব | Ramprasad Sen Achievements as a Poet
ছোটবেলা থেকে রামপ্রসাদ সেনের ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি দেখা যায়। তিনি প্রধানত কালী মায়ের বা শ্যামা মায়ের ভক্ত ছিলেন। তান্ত্রিক কালি সাধনায় অল্পদিনের মধ্যে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন।
কাজের সুবাদে তিনি কলিকাতায় এক ধনী জমিদারের সেরেস্তায় মুহুরীগিরি করতেন। কিন্তু কাজের প্রতি তার মন খুবই কম ছিল। সর্বদা তিনি কালী মায়ের ধ্যান করতেন। তিনি জমিদারের হিসাবের খাতায় – ‘আমায় দে মা তবিলদারি, আমি নেমকহারাম নয়মা শংকরী’। এই গানের লাইনটি লিখে রেখেছিলেন। জমিদার হিসাব মেলানোর সময় রামপ্রসাদ সেনের এই কৃতিত্ব দেখে তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট হন এবং রামপ্রসাদ সেনকে শ্যামা মায়ের বা কালী মায়ের সাধনা করার জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।
শুধু কলকাতার জমিদার নয় পরবর্তীকালে রামপ্রসাদ সেনের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদ সেনকে সভাসদরূপে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবুও গুনোগ্রাহী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদ সেনের উপর খুশি হয়ে তাঁকে ‘কবিরঞ্জন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং জমি জমা ও টাকা পয়সা দিয়ে সাধন ভজন ও কাব্য চর্চার সুযোগ করে দেন।
কালী মায়ের প্রতি ভক্তিই ছিল রামপ্রসাদ সেনের জীবনের প্রধান সম্বল। নিজের চিন্তা ভাবনা, আনন্দ বেদনা, সুখ-দুঃখ সমস্ত কিছুই তিনি শ্যামা মায়ের চরণ তলে সঁপে দিয়েছিলেন।
তাই রামপ্রসাদের পদাবলীতে কালী মায়ের প্রতি শিশুসুলভ আবদার অভিযোগ ও তিরস্কারের বিচিত্রভাব ব্যঞ্জিতভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর দুঃখ দুর্দশার কথা তিনি গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। যেমন –
মা আমার ঘুরাবি কত।
কলুর চোখ বাঁধা বলদের মত।।
ভবের গাছে বেঁধে দিয়ে মা পাক দিতেছ অবিরত।
তুমি কি দোষে করিলে আমায় ছটা কলুর অনুগত।।
রামপ্রসাদের গানের মাধ্যমে শ্যামাসঙ্গীতের প্রতি যে সহজ ভক্তিভাব ফুটে উঠেছে তা জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলীর চন্ডীদাস এর মত তিনি সহজ সুরে গভীর তত্ত্বের উপস্থাপন করেছিলেন। তাই শাক্ত পদাবলীতে রামপ্রসাদ সেনের (Shakta Poetry & Ramprasad Sen) অসামান্য কৃতিত্ব পরিলক্ষিত হয়।
তার গানের মধ্যে আরো পাওয়া যায় –
এবার কালী তোমায় খাবো।
তুমি খাও না হয় আমি খাই
দুয়ের একটা করে যাব।।
রামপ্রসাদ সেন জীবনে যত দুঃখ কষ্ট পেয়েছেন তা গানের মাধ্যমে কালী মায়ের কাছে অভাব অভিযোগ করেছেন। তিনি দুঃখকে আমল দেননি। তার সমস্ত দুঃখ কালী মায়ের কাছে সমর্পণ করে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছেন – ‘এবার ম’লে ডাকবো সর্বনাশী বলে’।
তিনি আরো বলেছেন – ‘দেখ সুখ পেয়ে লোক গর্ব করে, আমি করি দুঃখের বড়াই।’
আবার কোথাও বলেছেন – ‘মিঠার লোভে তিত মুখে সারা দিনটা গেল।’
কালী মায়ের বন্দনার মাধ্যমে রামপ্রসাদ সেন বিভিন্ন নীতিকথা প্রচার করেছেন। যেগুলো সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আজীবনের জন্য স্থান করে নিয়েছে। যেমন –
ডুব দেরে মন কালি বলে,
হৃদি রত্নাকরের অগাধ জলে।
কামাদি ছয় রিপু আছে তাহার লোভে সদাই চলে।
তুমি বিবেক হলদি গায়ে মেখে নাও।
ছোঁবে না তার গন্ধ পেলে।
ডুব দেরে মন কালী বলে।।
কাব্য বা সাহিত্য রচনা | Ramprasad Sen Poem Analysis
রামপ্রসাদ সেন ‘বিদ্যাসুন্দর’ ও ‘কৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য রচনা করেছিলেন। তার এই কাব্য ও সাহিত্য কীর্তি ছিল মূলত শ্যামা সংগীত গুলোর উপর ভিত্তি করে।
বিদ্যাসুন্দর কাব্যে রামপ্রসাদ লিখেছেন – ‘গ্রন্থ যাবে গড়াগড়ি গানে হব ব্যস্ত’। বাস্তব ক্ষেত্রে রামপ্রসাদ সেনের জীবনেও তাই ঘটেছিল। তিনি আজীবন মানুষকে জননী শ্যামা মায়ের পদতলে আশ্রয় নেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন।
যাই হোক রামপ্রসাদ সেন বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর সুমধুর কন্ঠ ও শ্যামা সংগীত গুলির জন্য।
সঙ্গীতে রামপ্রসাদ সেনের কৃতিত্ব
রামপ্রসাদ সেন কেবলমাত্র সাধক ও কবি ছিলেন না। তার সুরেলা কন্ঠ মানুষকে মোহিত করতেন। অর্থাৎ তিনি একদিকে গায়কও ছিলেন। কবি প্রদত্ত গানের সুর রামপ্রসাদী সুর নামে সঙ্গীত সাহিত্যে ঐতিহ্য হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। কথিত আছে রামপ্রসাদ সেনের গান শুনে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুগ্ধ হয়েছিলেন।
রামপ্রসাদ সেনের রচিত শ্যামা সংগীতের সংখ্যা প্রায় তিনশোর কাছাকাছি। গানগুলির মধ্যে আগমনী ও বিজয়ার পদে শ্যামা মায়ের তত্ত্ব, নানা ধরনের নীতিকথা, সাধন ভজনের কথা প্রভৃতি স্থান পেয়েছে।
রামপ্রসাদের গানে ছিল ভক্তিভাবুকতা ও আধ্যাত্মিক কথা। তাই বিভিন্ন সাহিত্যিক সমালোচক বলেছেন -রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব এর বহু পূর্বে সীমার মধ্যে অসীম সাধনার পথিকৃৎ রামপ্রসাদ সেন।
উপসংহার
তাই বলা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় শ্যামা মায়ের বা কালী মাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাধকের উত্থান ও শাক্ত পদাবলীর বিস্তার লাভ করেছিল। তাঁদের মধ্যে রামপ্রসাদ সেন অন্যতম ও জনপ্রিয়। তাই রামপ্রসাদ সেন কেবল একজন কবি নন, তিনি বাংলা শাক্ত সাহিত্যের প্রাণপুরুষ। ভক্তি, মানবিকতা ও দর্শনের অপূর্ব সংমিশ্রণে তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর কবি কৃতিত্ব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে দীর্ঘকাল আলোকিত করে রাখবে, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
তথ্যসূত্র | Sources
- বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৩-৫ খন্ড)- সুকুমার সেন
- বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস- সজনীকান্ত দাস
- বাংলা সাহিত্যে গদ্য- সুকুমার সেন
- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (৬-৯)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
- বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা (৩-৪)- ভূদেব চৌধুরী
- আধুনিক বাংলা কাব্য- তারাপদ মুখোপাধ্যায়
- উনিশ শতকের গীতিকাব্য- অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
- বাংলা সাময়িক পত্র- ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
- রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজ- অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
- আমার কালের কয়েকজন কবি- জগদীশ ভট্টাচার্য
- Ramprasad Sen Achievements as a Poet
- Internet sources
প্রশ্ন – রামপ্রসাদ সেনের জন্মস্থান কোথায়
উত্তর – অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আনুমানিক ১৭২০ থেকে ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে রামপ্রসাদ সেন 24 পরগনার হালিশহরের কুমারহট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন – রামপ্রসাদ সেনের জন্ম সাল কত
উত্তর – রামপ্রসাদ সেনের জন্ম সাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মনে করা হয় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আনুমানিক ১৭২০ থেকে ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে রামপ্রসাদ সেন জন্মগ্রহণ করেন।
রামপ্রসাদ সেনের উপাধি কি?
উত্তর – রামপ্রসাদ সেনের উপাধি ছিল কবিরঞ্জন। এই উপাধিটি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে প্রদান করেন।
রামপ্রসাদ সেন কোন রাজার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন
উত্তর – রামপ্রসাদ সেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। শুধু তাই নয়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদ সেনকে জমিজমা ও বৃত্তি দিয়ে তার সাধন ভজন ও কাব্য চর্চার করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন – শাক্ত পদাবলীর শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর – অষ্টাদশ শতাব্দীর বিভিন্ন কবিদের মধ্যে শাক্ত পদাবলীর শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন রামপ্রসাদ সেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে শাক্ত পদাবলীর প্রবর্তক এবং তাঁর রচিত “রামপ্রসাদী” গানগুলি আজও সমান জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাই তাঁকে আদি শাক্ত কবি বলে অভিহিত করা হয়।
প্রশ্ন – রামপ্রসাদ সেনকে কবিরঞ্জন উপাধি কে দিয়েছিলেন?
উত্তর – মহারাজ ও গুণগ্রাহী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদ সেনকে কবিরঞ্জন (কবিদের বিনোদনকারী) উপাধি দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন – রামপ্রসাদের পুরো নাম কী?
উত্তর – রামপ্রসাদের পুরো নাম হল রামপ্রসাদ সেন। যিনি শাক্ত পদাবলীর আদি কবি।
Latest Articles
- ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রশ্ন উত্তর | Fort William College Quiz Question and Answers for Competitive Exams
- বাংলা গদ্য সাহিত্যে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান | Contribution of Serampore Mission to Bengali Prose
- বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান | Contribution of Fort William College Bengali Prose
- বাংলা গদ্য সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা | Vidyasagar Contribution to Bengali Literature
- বাংলা গদ্যের বিকাশে রামমোহন রায়ের অবদান | Raja Ram Mohan Roy in Prose Literature
রামপ্রসাদ সেনের কবি কৃতিত্ব | Ramprasad Sen Achievements সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।





3 thoughts on “শাক্ত পদাবলীতে রামপ্রসাদ সেনের কৃতিত্ব | Ramprasad Sen Achievements”