বাংলা সাহিত্যে ভাগবত পুরাণের অনুবাদের ক্ষেত্রে মালাদার বসুর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। কবি কৃত্তিবাসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভাগবত অনুবাদে মালাধর বসুর কবি কৃতিত্ব (Maladhar Basu Bhagavata Translation Poetic Excellence) ছিল সমৃদ্ধ প্রকৃতির।
মালাধর বসুর জীবনী | Biography of Maladhar Basu
সাহিত্যিক ও কবি মালাধর বসুর জীবনী নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্যিক গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে গ্রন্থ রচনা সময় মালাধর বসু তাঁর নিজের সম্পর্কে কিছুটা সূত্রপাত করেছিলেন। তাই মনে করা হয় মালাধর বসু মধ্যযুগের অন্যতম সাহিত্যিক।
মালাধর বসুর জন্মস্থান বর্ধমান জেলার কুলীন গ্রামে বিখ্যাত কায়স্থ পরিবারে। মালাধর বসুর পিতার নাম – ভগিরথ বসু এবং মায়ের নাম ছিল – হিন্দু মতি। মালাধর বসুর পুত্র রামানন্দ বসু ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্ত ও পার্ষদ।
মালাধর বসুর উপাধি
মালাধর বসুর কবি কৃতিত্বে খুশি হয়ে গৌড়েশ্বর তাঁকে গুনরাজ খান উপাধিতে ভূষিত করেন। কবি এই উপাধিকে একটি ছন্দের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন –
গুণ নাই, অধম মুই নাই কোন জ্ঞান,
গৌড়েশ্বর দিলা নাম গুনরাজ খান।
মালাধর বসুর কবি কৃতিত্ব | Maladhar Basu Bhagavata Translation Poetic Excellence
মধ্যযুগের ভারতবর্ষে সংস্কৃত সাহিত্যের বিশেষ করে ধর্মগ্রন্থগুলি অনুবাদের ক্ষেত্রে শাক্ত পদাবলীতে কমলাকান্ত ভট্টাচার্য ও রামপ্রসাদ সেন, রামায়ণ অনুবাদে কৃত্তিবাস ওঝা এবং মহাভারত অনুবাদে কাশীরাম দাস এর মত ভাগবত অনুবাদে মালাধর বসু ছিলেন অন্যতম কৃতি কবি ও অনুবাদক।
সংস্কৃত সাহিত্যে মোট 18 টি পুরাণ সাহিত্য এবং ৩৬ টি উপ-পুরাণের মধ্যে ভাগবত ছিল ভারতবর্ষে সর্বাধিক জনপ্রিয় ধর্মগ্রন্থ। ভাগবত কেবলমাত্র ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষায় নয়, বরং বিভিন্ন ভাষায় ভারতবর্ষের বাইরেও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশেষ করে ইউরোপের এই ভাগবত পুরাণ সর্বপ্রথম অনূদিত হয় এবং বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সংস্কৃত থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় ভাগবত অনুবাদ হলেও বাংলা ভাষায় ভাগবত অনুবাদ করে মালাধর বসু বিশেষ কৃতিত্ব (Maladhar Basu Bhagavata Translation Poetic Excellence) লাভ করেছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর কবি কৃতিত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল।
তাই চৈতন্যপূর্ববর্তী কালে ভাগবত পুরাণের অনুবাদক হিসেবে মালাধর বসু ছিলেন অনন্য। শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যে মালাধর বসু শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক রূপ তুলে ধরতে সচেষ্ট হন।
কবি মালাধর বসু তাঁর অনুবাদ সাহিত্য রচনার কাজে যার দ্বারা উৎসাহিত হয়েছেন, সেটি তিনি গ্রন্থের শুরুতে উল্লেখ করেছেন, ছন্দের মাধ্যমে –
কায়স্থ কুলেতে জন্ম কুলীন গ্রামে বাস।
স্বপ্নে আদেশ দিলেন প্রভু ব্যাস।।
তার আজ্ঞা মতে গ্রন্থ করিনু রচন।
বদন ভরিয়ে হরি বল সর্বজন।।
মালাধর বসুর কাব্যে শ্রীকৃষ্ণের কলেবর ত্যাগের কথা থাকলেও বিজয় অর্থে মহাপ্রয়াণ বা মৃত্যু নয়। দেবতার শোভাযাত্রা, কৃষি কথা বা বিজয় গৌরব এই অর্থে ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ নামকরণ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন জনসাধারণের কাছে দুর্বোধ্য সংস্কৃত ভাষা ভাগবতের কাহিনী ও আদর্শ সঠিকভাবে প্রচার করতে ব্যর্থ। তাই তিনি তার লেখনির সৃজনশীলতা দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ভাগবতের বাংলা অনুবাদ করেন।
মালাধর বসু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কীর্তিকলাপ বর্ণনা করে ধর্মীয় আদর্শে মানুষকে অন্ধবিশ্বাস ও অবিদ্যা থেকে উদ্ধার করতে প্রয়াসী হন। তিনি তাঁর কাব্যে লিখেছেন –
ভাগবত অর্থ যত পয়ারে বান্ধিয়া।
লোক নিস্তারিতে গাহি পাঁচালি রচিয়া।।
ভাগবত শুনিতে অনেক অর্থ চাহি।
তেকারণে ভাগবত গীত ছন্দে গাহি।।
কলিকালে পাপচিত্ত হব সব নর।
পাঁচালির রসে লোক হইব বিস্তর।।
গাহিতে গাহিতে লোক পাইব নিস্তার।
শুনিয়া নিষ্পাপ হব সকল সংসার।।
মালাধর বসু কবি পরিচয় ও কাব্য রচনাকাল
ভাগবতের অনুবাদ হিসেবে মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্য রচনা করেন ১৪৭৩ থেকে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। তিনি ১৩৯৫ শকে গ্রন্থ আরম্ভ করেন। মালাধর বসু মূলত ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্দের কৃষ্ণকথাশ্রিত অংশের অনুসরণ করে ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ রচনা করেছেন। ভাগবতের কৃষ্ণলীলা সমগ্র বাঙালির কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি সর্বপ্রথম লেখনী ধারণ করেছিলেন। ভগবানের ঐশ্বর্যভাবের মধুরভজনের মুহূর্ত বিগ্রহ শ্রীচৈতন্য এর মাধুর্যের দিকটি নিজের জীবন দিয়ে তুলে ধরেছেন।
উপসংহার | Analysis
পরিশেষে বলা যায়, ভাগবত অনুবাদে মালাধর বসুর কবি কৃতিত্ব মূলত তাঁর ভাষা, ভাবানুবাদ, ভক্তিরস ও কাব্যশৈলীর মধ্যে নিহিত ছিল। তিনি বাংলা সাহিত্যে ভক্তিসাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর (Foundation of Devotional Literature) স্থাপন করেন—যার প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
তথ্যসূত্র | Sources
- বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৩-৫ খন্ড)- সুকুমার সেন
- বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস- সজনীকান্ত দাস
- বাংলা সাহিত্যে গদ্য- সুকুমার সেন
- বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (৬-৯)- অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
- বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা (৩-৪)- ভূদেব চৌধুরী
- আধুনিক বাংলা কাব্য- তারাপদ মুখোপাধ্যায়
- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – প্রাচীন ও মধ্যযুগ – ডক্টর শ্রীমন্তকুমার জানা – ওরিয়েন্টাল বুক কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড।
- Einsohn, A., & Schwartz, M. (2019). The copyeditor’s handbook: A guide for book publishing and corporate communications (4th ed.). University of California Press.
- Butcher, J., Drake, C., & Leach, M. (2016). Butcher’s copy-editing: The Cambridge handbook for editors, copy-editors and proofreaders (4th ed.). Cambridge University Press.
- Chicago Manual of Style. (2017). The Chicago manual of style (17th ed.). University of Chicago Press.
- Ritter, R. M. (2015). The Oxford guide to style (New Hart’s rules) (2nd ed.). Oxford University Press.
- Luey, B. (2010). Handbook for academic authors (5th ed.). Cambridge University Press.
- Maladhar Basu Bhagavata Translation Poetic Excellence
- Internet sources
মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয় প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন – মালাধর বসু কোন কাব্যের অনুবাদ করেছিলেন তার কাব্যের নাম কি?
উত্তর – মালাধর বসু সংস্কৃত ভাগবত পুরাণ অবলম্বনে বাংলায় ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ নামক কাব্য অনুবাদ করেছিলেন। অর্থাৎ মালাধর বসু শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্য রচনা করেন।
প্রশ্ন – মালাধর বসু কে ছিলেন?
উত্তর – মালাধর বসু ছিলেন একজন মধ্যযুগের একজন প্রখ্যাত বৈষ্ণব কবি, অনুবাদক ও সাহিত্যিক। যিনি বাংলা ভাষায় ভাগবত অনুবাদ করেন। তাঁর অনূদিত গ্রন্থের নাম হল ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’।
প্রশ্ন – মালাধর বসু ভাগবতের কোন অংশের অনুবাদ করেন?
উত্তর – মালাধর বসু শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের প্রথমাংশ (প্রথম স্কন্ধসহ প্রারম্ভিক অংশ) বাংলায় অনুবাদ করেন। অর্থাৎ তিনি ভাগবতের আংশিক অনুবাদ করেছিলেন।
প্রশ্ন – মালাধর বসু কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর – মালাধর বসুর জন্মস্থান বর্ধমান জেলার কুলীন গ্রামে বিখ্যাত কায়স্থ পরিবারে।
প্রশ্ন – মালাধর বসু কোন শতকের কবি?
উত্তর – মালাধর বসু ছিলেন ১৫শ শতক বা মধ্যযুগের কবি।
প্রশ্ন – মালাধর বসু কার সভাকবি ছিলেন
উত্তর – মালাধর বসু ছিলেন আরাকান রাজা মেং সোয়াই (বা মেং বেন)–এর সভাকবি।
প্রশ্ন – বাংলা সাহিত্যে ভাগবতের প্রথম অনুবাদক কে?
উত্তর – বাংলা সাহিত্যে ভাগবতের প্রথম অনুবাদক হলেন মালাধর বসু।
প্রশ্ন – মালাধর বসুর পিতা মাতার নাম কি?
উত্তর – মালাধর বসুর পিতার নাম হল ভগিরথ বসু
প্রশ্ন – ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ গ্রন্থটির রচয়িতার নাম উল্লেখ করো।
উত্তর – ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ গ্রন্থটির রচয়িতার নাম হল মালাধর বসু।
Latest Articles
- অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিষয়বস্তু ও কাহিনী | Theme and story of Annadamangal Kavya
- কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত টীকা | Chaitanya Charitamrita by Krishnadas Kaviraj
- চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক খন্ড প্রশ্ন উত্তর | Chandimangal Akhetik Khanda Questions Answers
- চন্ডীমঙ্গল কাব্যের বিষয়বস্তু ও কাহিনী | Chandimangal Kavya
- চর্যাপদ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব | Historical Importance of Charyapada
- চৈতন্য ভাগবত রচনায় বৃন্দাবন দাসের কবি প্রতিভা | Poetic Genius of Vrindavan Das in Chaitanya Bhagavata
ভাগবত অনুবাদে মালাধর বসুর কবি কৃতিত্ব | Maladhar Basu Bhagavata Translation Poetic Excellence সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।






1 thought on “ভাগবত অনুবাদে মালাধর বসুর কবি কৃতিত্ব | Maladhar Basu Bhagavata Translation Poetic Excellence”