বাংলা ভাষা ভারতবর্ষ সহ পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমৃদ্ধশালী মাতৃভাষা। তাই বাংলা ভাষাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ও পরিমার্জন করতে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি বানান বিধি (West Bengal Bangla Academy Spelling Rules) প্রকাশিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি | West Bengal Bangla Academy Spelling Rules
বাংলা ভাষা হল ভারতবর্ষ সহ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধশালী ভাষা। এর বানানব্যবস্থায় মধ্যে একসময়ে অনেক বৈচিত্র্যধর্মী ও কিছু কিছু বিভ্রান্তি বা বানানগত ত্রুটি ছিল। কিন্তু এই বিভ্রান্তি দূর করতে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি ১৯৮৭ সালে একটি একীভূত বানানবিধি (Spelling Rules) প্রকাশ করে।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে নতুন সংস্করণে বাংলা বানানবিধিতে কিছু সংশোধন আনা হয়। এই বানানবিধি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, সংবাদপত্র ও সরকারি লেখালেখিতে মান্যতা দেওয়া হয়। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের লিখিত বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি (West Bengal Bangla Academy Spelling Rules) অনুসরণ করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধির প্রধান নিয়মসমূহ
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বাংলা বানানের সমতা বিধান এবং লিখন রীতি বাংলা বানানকে সরলীকরণ করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধির প্রধান নিয়মসমূহ উদাহরণ সহকারে আলোচনা করা হল –
যুক্তাক্ষর ব্যবহারের নিয়ম
যেখানে উচ্চারণে একটি মাত্র ধ্বনি শোনা যায়, সেখানে যুক্তাক্ষর ব্যবহার করা হয় না।
যেমন:
- লেখা হবে দরজা, নয় দ্বারজা
- লেখা হবে পত্র, নয় পত্ত্র
“ৎ” ধ্বনির ব্যবহার
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি অনুযায়ী “ৎ” কেবলমাত্র কিছু নির্দিষ্ট শব্দে ব্যবহৃত হয়, যেমন — মৎস্য, তৎক্ষণাৎ, সৎ ইত্যাদি। অপ্রয়োজনে “ৎ” ব্যবহার করা নিষেধ।
দীর্ঘ ও হ্রস্ব স্বরধ্বনি
বাংলা ভাষায় একসময় অনেক শব্দে হ্রস্ব ই/উ ও দীর্ঘ ঈ/ঊ— উভয় রূপে লেখা চলত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি-র বানানবিধি অনুযায়ী বর্তমানে এই বিভ্রান্তি দূর করে একটি নির্দিষ্ট রূপ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলা আকাদেমির বানানবিধি অনুসারে, হ্রস্ব ই (ই) ও উ (উ) ব্যবহৃত হবে, অর্থাৎ দীর্ঘ ঈ ও ঊ সাধারণত পরিহার করা হয়েছে।
🔹 উদাহরণসমূহ –
👉 হ্রস্ব ই / দীর্ঘ ঈ সম্পর্কিত শব্দ
| প্রচলিত রূপ | বাংলা আকাদেমির নির্ধারিত রূপ |
| অনুশ্রী, অনূষ্রী | অনুশ্রি |
| অনূরূপ, অনুরূপ | অনুরূপ |
| অশ্রী, অশ্রী | অশ্রি |
| ঊষা, ঊষী | ঊষা |
| চূড়ি, চূড়ী | চুড়ি |
| চিকিৎসা, চিকিৎসী | চিকিৎসা |
| ধর্মী, ধর্মী | ধর্মী |
| ধূলী, ধুলি | ধুলি |
👉 হ্রস্ব উ / দীর্ঘ ঊ সম্পর্কিত শব্দ
| প্রচলিত রূপ | বাংলা আকাদেমির নির্ধারিত রূপ |
| পাণি, পানি | পানি |
| বেণী, বেনী | বেনী |
| রাণী, রানী | রানি |
| সাৰী, শাড়ী, শাড়ি | শাড়ি |
| সূচি, সূচী | সূচি |
“ব” ও “ভ” এর ব্যবহার
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি অনুযায়ী “ভ” উচ্চারণ হলে “ভ” লিখতে হবে, “ব” নয়।
যেমন: ভাবনা, ভাব, ভাবী।
অন্যদিকে “বন”, “বেলা”, “বসন্ত” শব্দে “ব” ব্যবহৃত হবে।
“র” ও “ড়” ব্যবহারের নিয়ম
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি অনুযায়ী “র” ও “ড়” ব্যবহারের নিয়ম হল –
- “র” সাধারণত সব জায়গায় ব্যবহৃত হয়।
- “ড়” ও “ঢ়” কেবলমাত্র স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনধ্বনি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
যেমন: বড়, ঘোড়া, মেয়েড় (ভুল)।
অনুস্বার (ং) ও বিসর্গ (ঃ) এর ব্যবহার
বাংলা ভাষায় সব ক্ষেত্রে দ্বিত্বচিহ্ন (যেমন: দ্ধ, ন্ন, ব্ব ইত্যাদি) বজায় রাখা হয়। তবে বিসর্গযুক্ত শব্দে যদি প্রথম শব্দের শেষ অক্ষর দ্বিত্বচিহ্নিত রূপে থাকে, তবে তা সাধারণত একক অক্ষরে রূপান্তরিত করা হয়। অর্থাৎ, বাংলা উচ্চারণের সুবিধার জন্য দ্বিত্বচিহ্ন বাদ দেওয়া যেতে পারে।
- “ং” ব্যবহৃত হয় নাসিক্য ধ্বনি বোঝাতে। যেমন — চাঁদ, ইংরেজি, অঙ্গ।
- “ঃ” ব্যবহৃত হয় উচ্চারণে স্বরবিরতির জন্য। যেমন — বুদ্ধঃ, তৎঃপর।
| শেষ শব্দে দ্বিত্বচিহ্নযুক্ত রূপ | গঠিত রূপ | আকাদেমির নির্ধারিত রূপ |
| অহঃ + অহঃ | অহঃঅহঃ | অহরহ |
| ইত্যঃ + ইত্যঃ | ইত্যঃইত্যঃ | ইত্যাদি |
| পুরঃ + পুরুষ | পুরঃপুরুষ | পুরুষপুরুষ (না, → পুরুষ) |
| মুখঃ + মুখঃ | মুখঃমুখঃ | মুখোমুখি |
“য” ও “য়” ব্যবহারের নিয়ম
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি অনুযায়ী “য” ও “য়” ব্যবহারের নিয়ম হল –
- শব্দের শুরুতে ও মধ্যভাগে য ব্যবহার হয়। যেমন — যত, যোগ, যৌবন
- শব্দের শেষে বা ‘র’ পরে য় ব্যবহৃত হয়। যেমন — করয়, হায়, নয়
বিদেশি শব্দের বানান
বিদেশি শব্দ বাংলায় লেখার সময় বাংলা উচ্চারণ অনুযায়ী লিখতে হবে। অর্থাৎ ইংরেজিতে যে বানানটি আছে সেই বানানটিকে অনুসরণ করে লিখতে হয়।
যেমন: টেলিভিশন (Television), কম্পিউটার (Computer), হাসপাতাল (Hospital)।
অনুসর্গ ও উপসর্গের মিল
মূল শব্দ ও উপসর্গ বা অনুসর্গ একত্রে লিখতে হবে, আলাদা নয়।
যেমন: অশিক্ষা (না “অ শিক্ষা”), উপকারিতা (না “উপ কারিতা”)।
বাংলা সংখ্যার ব্যবহার
আধিকারিক নথি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা সংখ্যা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে —
০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯
“কী” ও “কি” ব্যবহারের নিয়ম
বাংলা ভাষায় “কী” এবং “কি” — এই দুটি শব্দের উচ্চারণে মিল থাকলেও তাদের অর্থ ও ব্যবহার এক নয়। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানানবিধি এই দুটি শব্দের ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
“কী”-এর ব্যবহার
“কী” ব্যবহৃত হয় — প্রধানত প্রশ্নবাচক সর্বনাম, বিশেষণ, এবং বিস্ময়বাচক অর্থে। এক্ষেত্রে “ই”-কার দীর্ঘভাবে উচ্চারিত হয়।
| ব্যবহারের ধরন | উদাহরণ |
| প্রশ্নবাচক সর্বনাম | তুমি কী খেতে চাও? |
| বিশেষণের বিশেষণ | কী সুন্দর দৃশ্য! |
| বিষয়ের বিশেষণ | কী নাম, কী কাজ, কীভাবে সমাধান পাবে? |
| বিস্ময়বাচক অব্যয় | কী আনন্দ! কী ভয়ংকর! |
“কি”-এর ব্যবহার
“কি” সাধারণত ব্যবহৃত হয় — বাক্যের মধ্যে প্রশ্নসূচক অব্যয় হিসেবে বা হ্যাঁ / না ধরনের জিজ্ঞাসা বোঝাতে। এখানে “ই”-কার হ্রস্ব (সংক্ষিপ্ত) উচ্চারণ হয়।
| ব্যবহারের ধরন | উদাহরণ |
| প্রশ্নসূচক অব্যয় | তুমি চা খাবে কি? |
| দ্বিধা বা নিশ্চিতকরণ | সে সত্যি বলছে কি না বলছে? |
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বানানবিধি পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী ও গুণমানসম্মত করে তুলেছে। এই নিয়ম মেনে চললে লেখায় শুদ্ধতা ও ঐক্য বজায় থাকে। অর্থাৎ বানানগত জটিলতা কোনো লেখাকে পাঠকের কাছে গ্রহণহীন করে তুলতে পারে। তাই বাংলা ভাষার সৌন্দর্য রক্ষা করতে প্রতিটি লেখকের উচিত এই বানানবিধি অনুসরণ করা।
তথ্যসূত্র | Sources
- বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনা – ডঃ তারকনাথ ভট্টাচার্য, ইউনাইটেড বুক এজেন্সী।
- পাণ্ডুলিপি পঠন সহায়িকা – ড. কল্পনা হালদার, সাহিত্য লোক।
- Einsohn, A., & Schwartz, M. (2019). The copyeditor’s handbook: A guide for book publishing and corporate communications (4th ed.). University of California Press.
- Butcher, J., Drake, C., & Leach, M. (2016). Butcher’s copy-editing: The Cambridge handbook for editors, copy-editors and proofreaders (4th ed.). Cambridge University Press.
- Chicago Manual of Style. (2017). The Chicago manual of style (17th ed.). University of Chicago Press.
- Ritter, R. M. (2015). The Oxford guide to style (New Hart’s rules) (2nd ed.). Oxford University Press.
- Luey, B. (2010). Handbook for academic authors (5th ed.). Cambridge University Press.
- West Bengal Bangla Academy Spelling Rules
- Internet sources
প্রশ্ন – পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানানবিধি কত সালে চালু হয়?
উত্তর – ১৯৮৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ২০১২ সালে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
Latest Articles
- অশুদ্ধি সংশোধন – ধারণা, নিয়ম ও উদাহরণ | Error Correction in Bengali Grammar
- বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা | Role of Calcutta University in Bengali Spelling Reform
- পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি | West Bengal Bangla Academy Spelling Rules
- বাংলা যুক্তাক্ষরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উদাহরণসহ আলোচনা | Bengali Yuktakshar
- গ্রন্থ সম্পাদনায় সম্পাদকের ভূমিকা বা দায়িত্ব বা কাজ | Role of Editor in Book Publishing
- একজন দক্ষ প্রুফ রিডারের গুণাবলী | Qualities of a Good Proofreader
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি | West Bengal Bangla Academy Spelling Rules সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।





