বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বানান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা (Role of Calcutta University in Bengali Spelling Reform) হল অনবদ্য।
যে কোনো ভাষার প্রাণ হল বানান বা স্পেলিং। কারণ বানান ভুল ভাষাকে ও বাক্যকে বিকৃত করতে পারে। তাই যে কোনো ভাষার ক্ষেত্রে বানান সংস্কার আবশ্যিক বিষয়। প্রাচীন কালের বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বানান ব্যবহৃত হলেও সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে বানানের পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে বাংলা বানান সংস্কারে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি পরিলক্ষিত হয়, পাশাপাশি বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বর্তমান।
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা | Role of Calcutta University in Bengali Spelling Reform
বাংলা ভাষার বানান দীর্ঘদিন ধরে নানা আঞ্চলিক প্রভাব, সংস্কৃত ও পারসিক শব্দ এবং উচ্চারণগত পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিয়েছিল। ফলে লেখার ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি দেখা দিত। এই জটিলতা দূর করার জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিংশ শতকের শুরুতে একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ছিল— বাংলা বানানকে সহজ, সুশৃঙ্খল ও শিক্ষা উপযোগী রূপে প্রতিষ্ঠা করা।
কমিটি গঠন (Formation of the Committee)
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা হল ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষ কমিটি (Spelling Reform Committee) গঠন। বাংলা বানান সংস্কার সমিতির সভাপতি ছিলেন রাজশেখর বসু। ১৯৩৬ সালের মে মাসে কমিটি তাদের প্রস্তাব প্রকাশ করে এবং বাংলা ভাষার উপযুক্ত বানানরীতি নির্ধারণ করে।
সদস্যবৃন্দ ও তাঁদের ভূমিকা (Members and Their Role)
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত কমিটিতে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন বাংলার বিশিষ্ট পণ্ডিতেরা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন —
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – বানানের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য রক্ষার পক্ষে মত দেন।
- সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় – ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব ও ব্যাকরণভিত্তিক বানানরীতি প্রস্তাব করেন।
- রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী – শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বানানকে সরল করার পক্ষে মত দেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন —
“বানানের ঐক্য থাকলে ভাষার শিক্ষা সহজ হয়, কিন্তু ঐতিহ্য হারালে ভাষার প্রাণশক্তি নষ্ট হয়।”
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা যে সমস্ত দিক থেকে উল্লেখযোগ্য ছিল ও বানান সংক্রান্ত যে সমস্ত পরিমার্জন হয়েছিল, সেগুলি আলোচনা করা হল –
বানানের উপর প্রকাশিত গ্রন্থ (Book Publication)
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা হল ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রস্তাবনাগুলি সংকলন করে একটি প্রতিবেদন আকারে বই প্রকাশ করে। এটি “কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তিত বাংলা বানানরীতি (1936)” নামে পরিচিত, যা পরে বিভিন্ন অভিধানের সংযোজিত পরিশিষ্ট (appendix) হিসেবেও স্থান পায়।
বিকল্প বর্জন
বাংলা বানানের ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্পের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে এনে একটি নির্দিষ্ট রূপকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল যে সকল শব্দের বানানে একাধিক রূপ প্রচলিত ছিল, সেখান থেকে একটি রূপকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করা এবং অন্য বিকল্পগুলি বর্জন করা।
উদাহরণ:
- আগে যেখানে ‘উড়িয়া’ এবং ‘উড়ে’ দুটোই লেখা চলত, সেখানে একটি নির্দিষ্ট রূপের ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
- বিভিন্ন প্রত্যয়ের বানানে ঈ/ই বা ঊ/উ-এর ব্যবহারে যে বিকল্প ছিল, তা বর্জন করা।
অ-তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে নিয়ম প্রবর্তন
তৎসম শব্দের পাশাপাশি অতৎসম (দেশজ, বিদেশি, তদ্ভব) শব্দের বানানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করা হয়। অর্থাৎ তৎসম (সংস্কৃত থেকে সরাসরি আগত) শব্দগুলির বানান অপরিবর্তিত রেখে, দেশজ, বিদেশি, তদ্ভব এবং মিশ্র শব্দের বানানের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সরল নিয়ম তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ্য হল অ-তৎসম শব্দের বানানে উচ্চারণ-অনুসারী এবং সরল পদ্ধতি অনুসরণ করা।
- উদাহরণ:
- দেশজ শব্দ: ‘কুঁড়ি’, ‘ঝোলা’, ‘চুরি’
- তদ্ভব শব্দ: ‘চাঁদ’ (মূলত চন্দ্র থেকে), ‘হাত’ (মূলত হস্ত থেকে)
- বিদেশি শব্দ: ‘ফুটবল’, ‘আইন’, ‘শার্ট’ (এসব ক্ষেত্রে মূর্ধন্য ‘ণ’, মূর্ধন্য ‘ষ’ এবং দীর্ঘ ই/উ-এর ব্যবহার বর্জন করা হয়)।
হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার ব্যবহার
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান সংস্কারের ক্ষেত্রে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার ব্যবহার উপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম চালু করা হয়। এই নীতিটি ছিল বানানের সরলীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী। অর্থাৎ তৎসম শব্দ ভিন্ন অন্য সকল শব্দের ক্ষেত্রে সাধারণত হ্রস্ব ই-কার (ি) এবং হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
এর উদ্দেশ্য হল কেবলমাত্র তৎসম শব্দ ছাড়া অন্য সকল অ-তৎসম শব্দের (তদ্ভব, দেশজ, বিদেশি, মিশ্র) বানানে সাধারণত হ্রস্ব ই-কার (ি) এবং হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহৃত হবে। আবার, দীর্ঘ ই-কার (ী) বা দীর্ঘ উ-কার (ূ) কেবলমাত্র তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ:
| শব্দের বিভাগ | হ্রস্ব ই-কার (ি) ব্যবহার | হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহার |
| অ-তৎসম শব্দ | দিদি, খুশি, পাখি, শাড়ি, ঝুলি, চাবি, খুশি, মিষ্টি, জিনিস, আসামি | পুজো, দুপুর, বুড়ো, খুঁটি, সুরু, আলু, রুল, টুপ, ফুটবল |
| তৎসম শব্দ (নিয়ম রক্ষিত) | কৃতি, গতি, মতি, বিধি, আদি | ভূষণ, মুহূর্ত, অদ্ভুত, কূল, শূন্য |
ণ/ন এবং শ/ষ/স এর ব্যবহার বিধি
স্বরধ্বনির পরব্যঞ্জন ধ্বনির ব্যবহারে যে জটিলতা ছিল, তা দূর করে সরল ব্যবহারের দিকে জোর দেওয়া হয়।ণ/ন: তৎসম শব্দ ভিন্ন অন্য সকল শব্দের বানানে দন্ত্য ‘ন’ ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। শুধুমাত্র তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ‘ণ’-এর ব্যবহার বজায় থাকে।
আবার, শ/ষ/স: অ-তৎসম শব্দে সাধারণত তালব্য ‘শ’ বা দন্ত্য ‘স’ ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়। কেবল তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ‘ষ’-এর নিয়ম রক্ষা করা হয়।
উদাহরণ:
- ণ/ন: ‘কান’, ‘রান্না’, ‘জিনিসপত্র’, ‘পানোয়ার’ (বিদেশি) – সর্বত্র দন্ত্য ‘ন’ ব্যবহার করা হয়, যদিও বানানটি বিদেশি শব্দ। কিন্তু ‘কারণ’, ‘পুণ্য’ (তৎসম) – মূর্ধন্য ‘ণ’ বজায় থাকে।
- শ/ষ/স: ‘শার্ট’, ‘পুলিশ’, ‘সরকার’ – অ-তৎসম শব্দে ‘ষ’ ব্যবহার না করে ‘শ’ বা ‘স’ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ‘বিষ’, ‘বিশেষণ’, ‘শ্রেষ্ঠ’ (তৎসম) – মূর্ধন্য ‘ষ’ বজায় থাকে।
সংস্কারের মূল দিকসমূহ (Main Features of the Reform)
১৯৩৬ সালের প্রস্তাবনায় কমিটি যে বিষয়গুলো নির্ধারণ করে, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল —
| সংস্কারের ক্ষেত্র | উদাহরণ | পরিবর্তনের ব্যাখ্যা |
| দ্বিত্ববর্ণ | কর্ম্ম → কর্ম | অপ্রয়োজনীয় দ্বিত্ব বাদ |
| যুক্তাক্ষর সরলীকরণ | সত্ত্ব → সত্য | উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা |
| সংস্কৃত শব্দের রূপ নির্ধারণ | বিদ্য্ → বিদ্যা | মান্য রূপ নির্ধারণ |
| বিদেশি শব্দের একরূপতা | স্কুল, রেল, পেন | ইংরেজি শব্দে বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য |
| দীর্ঘ ও হ্রস্ব স্বরধ্বনি | শীলা → শিলা | ধ্বনিভিত্তিক সঠিক রূপ প্রস্তাব |
উপসংহার
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বানান সংকলনের জন্য একটি সমিতি নিযুক্ত করেন। এই সমিতিতে লেখক ও অধ্যাপকদের কাছে বানান সংক্রান্ত বিভিন্ন মতামত সংগ্রহ করা হয়।
তাই বাংলা বানান সংস্কারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা করেনি, বরং শিক্ষার সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করেছে। এই সংস্কার বাংলা ভাষাকে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক করে তুলেছে।
তাদের এই অবদান বাংলা ভাষার ইতিহাসে একটি স্থায়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তথ্যসূত্র | Sources
- বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনা – ডঃ তারকনাথ ভট্টাচার্য, ইউনাইটেড বুক এজেন্সী।
- পাণ্ডুলিপি পঠন সহায়িকা – ড. কল্পনা হালদার, সাহিত্য লোক।
- Einsohn, A., & Schwartz, M. (2019). The copyeditor’s handbook: A guide for book publishing and corporate communications (4th ed.). University of California Press.
- Butcher, J., Drake, C., & Leach, M. (2016). Butcher’s copy-editing: The Cambridge handbook for editors, copy-editors and proofreaders (4th ed.). Cambridge University Press.
- Chicago Manual of Style. (2017). The Chicago manual of style (17th ed.). University of Chicago Press.
- Ritter, R. M. (2015). The Oxford guide to style (New Hart’s rules) (2nd ed.). Oxford University Press.
- Luey, B. (2010). Handbook for academic authors (5th ed.). Cambridge University Press.
- Role of Calcutta University in Bengali Spelling Reform
- Internet sources
প্রশ্ন – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বানান সংস্কার কমিটি কোন সালে গঠিত হয়েছিল?
উত্তর – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বানান সংস্কারের জন্য সমিতি বা কমিটি গঠিত হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। ১৯৩৫ সালের নভেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে এই সমিতি গঠিত হয়।
প্রশ্ন – কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বানানের উপর প্রকাশিত গ্রন্থের নাম কী?
উত্তর – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা বানানের নিয়মাবলির উপর প্রকাশিত গ্রন্থের নাম হল – বাংলা বানানের নিয়ম (প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৬ সালের মে মাস, দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাস)
প্রশ্ন – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কার কমিটিতে কারা ছিলেন?
উত্তর – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কার কমিটিতে ছিলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ।
প্রশ্ন – ১৯৩৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে বানান সমিতি গঠন করেছিল, তার সভাপতি কে ছিলেন?
উত্তর – ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত বাংলা বানান সংস্কার সমিতির সভাপতি ছিলেন রাজশেখর বসু।
Latest Articles
- অশুদ্ধি সংশোধন – ধারণা, নিয়ম ও উদাহরণ | Error Correction in Bengali Grammar
- বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা | Role of Calcutta University in Bengali Spelling Reform
- পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানান বিধি | West Bengal Bangla Academy Spelling Rules
- বাংলা যুক্তাক্ষরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উদাহরণসহ আলোচনা | Bengali Yuktakshar
- গ্রন্থ সম্পাদনায় সম্পাদকের ভূমিকা বা দায়িত্ব বা কাজ | Role of Editor in Book Publishing
- একজন দক্ষ প্রুফ রিডারের গুণাবলী | Qualities of a Good Proofreader
বাংলা বানান সংস্কারে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা | Role of Calcutta University in Bengali Spelling Reform সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।





