ভারতে শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃৎ হল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। । অর্থাৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের (Vidyasagars Education and Social Reformer) ক্ষেত্রে অবদান বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 1820 সালে মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এবং মাতা ছিলেন ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভগবতী দেবী। বিদ্যাসাগর গ্রামের পড়াশোনা শেষ করে বাবার হাত ধরে তিনি কলকাতায় আসেন। কলকাতাতে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত নিয়ে পড়াশোনা করেন ও সংস্কৃতে পাণ্ডিত্য লাভ করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের বিবরণ | Vidyasagars Education and Social Reformer
সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের উত্তরসূরী হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের বিভিন্ন দিক পরিলক্ষিত হয়। তিনি বিভিন্ন প্রকার সামাজিক অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার প্রভৃতি দূরীকরণে প্রচেষ্টা করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হল –
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কার | Vidyasagars Education Reformer
শিক্ষা সংস্কার বা শিক্ষার বিভিন্ন দিকে সংস্কারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সামাজিক বিভিন্ন অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কার -এর প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান হল –
1. প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার সাধন
বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কারের একটি অন্যতম দিক হলো প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার সাধন। বিদ্যাসাগর বিভিন্ন জেলায় বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তিনি 1854 সালে তৎকালীন গভর্নর মিস্টার হ্যালিডে সাহেবের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কিছু সংখ্যক মডেল স্কুল স্থাপন এবং তার পরিদর্শনের ব্যবস্থা করেন। এর মধ্যে হুগলি, বর্ধমান, নদীয়া ও মেননীপুরের বিভিন্ন অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিদ্যাসাগর নিজের উদ্যোগে 35টি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন। যেগুলির কয়েকটির খরচ চালাতেন তিনি নিজে।
2. নারী শিক্ষার বিস্তার সাধন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার বিস্তার সাধনের জন্য বেথুন সাহেবের সহায়তায় 1849 সালে মেয়েদের শিক্ষার জন্য অবৈতনিক স্কুল প্রতিষ্টা করেন। যেটি পরে বেথুন বালিকা বিদ্যালয় নামে অধিক পরিচিত লাভ করেন। বিদ্যাসাগর 1850 সালে ডিসেম্বরে বেথুন বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাছাড়া বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য মেদিনীপুর, হুগলি, বর্ধমান প্রভৃতি জেলাতে ‘স্ত্রী শিক্ষা সম্মিলনী’ গঠন করেছিলেন।
3. নারীশিক্ষা ভান্ডার গঠন
বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার বিস্তারের ক্ষেত্রে নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গার বিদ্যালয় স্থাপন করেন. কিন্তু সরকারিভাবে পর্যাপ্তভাবে আর্থিক সাহায্য না আসার ফলে বিদ্যালয়গুলি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছিলেন না।
সেই জন্য বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার স্কুলগুলি পরিচালনার জন্য ও পর্যাপ্ত পরিমানে অর্থযোগানের জন্য বেসরকারীভাবে ‘নারীশিক্ষা ভান্ডার’ নামক তহবিল গঠন করেন।
4. পাঠ্যপুস্তক রচনা
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা বিস্তারের একটি অসামান্য অবদান হলো বাংলা ভাষায় বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক রচনা করা। অর্থাৎ বিদ্যাসাগর শিক্ষার উপযোগী বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। তাঁর রচিত সবথেকে জনপ্রিয় পাঠ্য পুস্তকটি হল বর্ণপরিচয়। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরের বর্ণজ্ঞান সম্ভবপর হয়।
এছাড়া বোধোদয়, কথামালা, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যরীতির প্রবর্তক ছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের বিবরণ | Vidyasagars Social Reformer
শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজ সংস্কারে ব্রতী হয়েছিলেন। কারণ তিনি দেখেছিলেন সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস প্রভৃতি সমাজ অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ।
তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের যে সমস্ত বিভিন্ন দিক পরিলক্ষিত হয়, সেগুলি হল –
1. বিধবা বিবাহ আইন পাস
তৎকালীন সমাজে কৌলিন্য প্রথার সুযোগ নিয়ে সেই সময়ে সমাজের কুলীন ব্রাহ্মণরা বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বিবাহ করত। এমনকি মৃত্যুমুখে পতিত বৃদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণরাও কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ করত। ফলস্বরূপ বালিকা বধূটি কিছুদিনের মধ্যে অকালে বিধবা হত।
বিদ্যাসাগর এই নিষ্ঠুর অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় 1856 সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়। এই আইন অনুসারে সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রথম বিধবা বিবাহ করেন। এই বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠান বিদ্যাসাগর স্বয়ং পরিচালনা করেছিলেন।
2. বহুবিবাহ নিবারণ
বিদ্যাসাগরের সময়ে হিন্দু সমাজে বহু বিবাহ প্রথা ছিল একটি সামাজিক ব্যাধি। এই বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। 1855 সালে তিনি 50 হাজার ব্যক্তিদের স্বাক্ষর নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই প্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য আবেদন করেন।
ব্রিটিশ সরকার এ ব্যাপারে আগ্রহী হলেও 1857 সালের মহাবিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবাসীর সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সরকার হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিলে বিষয়টি স্থগিত হয়ে যায়। তবে বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে পরবর্তীকালে বহু বিবাহ রোধে অনেকখানি সহায়ক হয়েছিল।
3. বাল্যবিবাহ রোধ
বহু বিবাহের পাশাপাশি তৎকালীন সময়ে কুলিন বয়স্ক ব্রাহ্মণেরা অল্প বয়সী মেয়েদেরকে বিয়ে করতেন। তাছাড়া বাল্যবিবাহ ছিল তৎকালীন সমাজের একটি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেন এবং বাল্যবিবাহ রোধ করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
অর্থাৎ বিদ্যাসাগর মনে করতেন সমাজের নারীরা শিক্ষিত হলে তবে সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার দূর করা সম্ভব হবে। তাই তিনি সর্বপ্রথম সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার দূরীকরণের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
4. ফান্ড গঠন
বিদ্যাসাগর হিন্দু বিধবা মহিলাদের আর্থিক দুরবস্থা নিবারণে হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুইটি ফান্ড গঠন করেন। অর্থাৎ এর মাধ্যমে বিদ্যাসাগর তৎকালীন সমাজের বিধবা মহিলাদের দুরাবস্থা দূর করার মাধ্যমে তাদেরকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।
উপসংহার
তৎকালীন অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কারযুক্ত সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে ব্রতী হয়েছিলেন তা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। সুতরাং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের (Vidyasagars Education and Social Reformer) যে অবদান ছিল তা তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে অনেকখানি সহায়তা করেছিল, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
তথ্যসূত্র (Sources)
- Aggarwal, J. C., Theory and Principles of Education. 13th Ed. Vikas Publishing House Pvt. Ltd.
- Nayak, B.K, Text Book of Foundation of Education. Cuttack, Odisha: KitabMhal
- Ravi, S. Samuel, A Comprehensive Study of Education, Fourth Printing-May 2016, Delhi – 110092, ISBN – 978-81-203-4182-1,
- Vidyasagars Education and Social Reformer
- Online Sources
প্রশ্ন – বিদ্যাসাগরের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ
উত্তর – বিদ্যাসাগরের জন্ম ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০ সালে ও তাঁর মৃত্যু হয় ২৯ জুলাই ১৮৯১ সালে।
প্রশ্ন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত দুটি গ্রন্থের নাম
উত্তর – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত দুটি গ্রন্থের নাম হল – বর্ণপরিচয় ও কথামালা। বর্ণপরিচয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সবথেকে জনপ্রিয় একটি বই।
প্রশ্ন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছদ্মনাম কি
উত্তর – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রধান ছদ্মনাম হল ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’। আবার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটি পরিচিত ছদ্মনাম ছিল “বেতাল ভট্ট” (Betal Bhatt)।
প্রশ্ন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত হন কেন?
উত্তর – সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জন্য Sanskrit College Kolkata থেকে তাঁকে “বিদ্যাসাগর” (বিদ্যার সাগর) উপাধি দেওয়া হয়। অর্থাৎ তিনি এত বেশি জ্ঞানী ছিলেন যে তাঁকে “বিদ্যার সমুদ্র” বলা হয়।
প্রশ্ন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম কি?
উত্তর – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম হল আত্মচরিত।
প্রশ্ন – বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম কি?
উত্তর – বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম হল – ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রশ্ন – বিদ্যাসাগর রচিত শিক্ষামূলক গ্রন্থ কোনটি?
উত্তর – রচিত অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষামূলক গ্রন্থ হলো Barnaparichay (বর্ণপরিচয়)। এই বইটি প্রাথমিক স্তরে বাংলা ভাষা শেখার জন্য শিশুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাথমিক পাঠ্যবই হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পদবী কি?
উত্তর – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পদবী হল – বন্দোপাধ্যায়। তবে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা হিসাবে সই করতেন। কারণ শর্মা হল ব্রাহ্মণদের উপনাম।
আরোও পোস্ট পড়ুন
- বৌদ্ধ দর্শনের অষ্টাঙ্গিক মার্গ আলোচনা করো |8 or Eightfold Path of Buddha
- সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান | Raja Ram Mohan Roy Social Reformer
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের বিবরণ দাও | Vidyasagars Education and Social Reformer
- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন | UGC এর গঠন ও কার্যাবলী | University Grants Commission
- NCTE এর কার্যাবলী আলোচনা করো | 10 Functions of NCTE
- DIET এর কার্যাবলী আলোচনা করো | 10 Functions of DIET
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের বিবরণ দাও | Vidyasagars Education and Social Reformer সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।






অসংখ্য ধন্যবাদ